মানুষের জীবন সবসময় একরকম থাকে না। কখনো সচ্ছলতা আসে, কখনো অভাব দেখা দেয়। কখনো ব্যবসায় লাভ হয়, আবার কখনো হঠাৎ লোকসান আসে। কারও চিকিৎসার জন্য জরুরি অর্থের প্রয়োজন হয়, কারও সন্তানের পড়াশোনার খরচ, কারও ঘর-সংসারের সংকট, আবার কারও জীবনে এমন বিপদ আসে, যা সাময়িকভাবে তাকে আর্থিকভাবে অসহায় করে ফেলে। এমন সময়ে একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষ দাঁড়ানোই মানবতার পরিচয়। আর একজন মুসলমানের জন্য এটি শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
ইসলামে মানুষের আর্থিক সংকটে সহযোগিতা করার একটি সুন্দর ব্যবস্থা হলো ‘কর্জে হাসানা’। আরবি ‘কর্জ’ অর্থ ঋণ এবং ‘হাসানা’ অর্থ উত্তম বা সুন্দর। অর্থাৎ কর্জে হাসানা হলো এমন ঋণ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো মানুষকে দেওয়া হয় এবং যার বিনিময়ে ঋণদাতা সুদ বা অতিরিক্ত কোনো সুবিধা দাবি করেন না। এর উদ্দেশ্য হলো বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা, তার অসহায়ত্বকে নিজের লাভের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা নয়। কর্জে হাসানার মর্যাদা বোঝাতে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এক অসাধারণ ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কে সে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তা হলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। আল্লাহ সংকুচিত করেন এবং প্রশস্ত করেন এবং তাঁর কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে’ (সুরা বাকারা : ২৪৫)।
এখানে ‘আল্লাহকে ঋণ দেওয়া’ বলতে আক্ষরিক অর্থে আল্লাহকে ঋণ দেওয়া বোঝানো হয়নি। কারণ আল্লাহ তায়ালা কারও মুখাপেক্ষী নন, বরং তিনি সব সম্পদের প্রকৃত মালিক। বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে সম্পদ ব্যয় করে, আল্লাহ সম্মানজনকভাবে সেটিকে নিজের জন্য ‘ঋণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর পথে ব্যয় করা কোনো সম্পদই প্রকৃত অর্থে নষ্ট হয় না। মানুষ যা ব্যয় করে, আল্লাহ তার প্রতিদান বহুগুণে ফিরিয়ে দেন।
মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো, সম্পদ ব্যয় করলে মনে হয় সম্পদ কমে গেল। কিন্তু মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। সে বিশ্বাস করে, সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো অসহায় মানুষের প্রয়োজন পূরণে অর্থ ব্যয় করলে বাহ্যিকভাবে তার সম্পদ কিছুটা কমলেও আখেরাতের হিসাবে তার সম্পদ বেড়ে যায়। কারণ আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং তাঁর প্রতিদানের কোনো সীমা নেই। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের জন্য বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ অতি কৃতজ্ঞতাশীল, পরম সহনশীল’ (সুরা তাগাবুন : ১৭)।
এই আয়াতে কর্জে হাসানার প্রতিদানের দুটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বান্দার ব্যয়কে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তাকে ক্ষমা করবেন। অর্থাৎ কর্জে হাসানা শুধু মানুষের দুনিয়ার প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়, এটি একজন মুমিনের আখেরাতের কল্যাণেরও কারণ হতে পারে।
কর্জে হাসানার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এতে একজন অভাবী মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষা পায়। অনেক মানুষ আছেন, যারা দান গ্রহণ করতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে সুদমুক্ত ঋণ পেলে তারা নিজের প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন এবং পরে সামর্থ্য অনুযায়ী তা ফেরত দিতে পারেন। ফলে সাহায্য গ্রহণ করেও তার আত্মসম্মান অক্ষুণ্ন থাকে। ইসলাম শুধু ঋণ দেওয়ার কথা বলেনি, ঋণগ্রহীতার অসচ্ছলতার প্রতিও সহানুভূতি দেখাতে নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি ঋণগ্রহীতা অসচ্ছল হয়, তা হলে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া উচিত। আর তোমরা যদি ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা জানতে’ (সুরা বাকারা : ২৮০)। এই আয়াত বর্তমান সমাজের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েন, তা হলে তার ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করা ইসলামের শিক্ষা নয়। তাকে সময় দিতে হবে। আর ঋণদাতা যদি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণের কিছু অংশ বা পুরো ঋণ মাফ করে দিতে পারেন, তা হলে সেটি আরও উত্তম। কারণ একজন অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘব করার মধ্যে যে মানবিকতা রয়েছে, ইসলাম তার বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে