এই সৃষ্টিজগতের প্রতিটি সৃষ্টি মহান আল্লাহ তায়ালার একেকটি নিদর্শন। আকাশ, পৃথিবী, পাহাড়, নদী, সাগর প্রতিটি সৃষ্টি তাঁর একক ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও কুদরতের উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু দৈনন্দিন ব্যস্ততার আবরণে মানুষ অনেক সময় এসব নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়েও সেগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে না।
অথচ পবিত্র কুরআনে বারবার মানুষকে প্রকৃতির দিকে তাকাতে, চিন্তা করতে এবং সৃষ্টির মধ্য দিয়ে স্রষ্টাকে চিনতে আহ্বান জানিয়েছে। কারণ প্রকৃতির প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি ভারসাম্য এবং প্রতিটি বিস্ময় মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও নিখুঁত পরিকল্পনার ঘোষণা বহন করে।
এমনই এক বিস্ময়কর নিদর্শনের কথা আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন মিঠা ও লোনা পানির মধ্যকার অদৃশ্য অন্তরায় সম্পর্কে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তিনিই দুটি সাগরকে প্রবাহিত করেছেন। একটি সুপেয় সুস্বাদু, অপরটি লবণাক্ত ক্ষারবিশিষ্ট এবং তিনি উভয়ের মাঝখানে একটি অন্তরায় ও একটি অনতিক্রম্য সীমানা স্থাপন করেছেন।’ (সুরা আল-ফুরকান : ৫৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষের দৃষ্টি এমন এক বাস্তবতার দিকে আকর্ষণ করেছেন, যা যুগে যুগে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। পৃথিবীর অসংখ্য নদী প্রতিনিয়ত সাগরে গিয়ে মিলিত হলেও নদীর মিঠাপানি ও সাগরের লোনাপানি আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়মে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখে।
মানুষের চোখে এটি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও একজন মুমিনের কাছে এটি মহান রবের নিখুঁত ব্যবস্থাপনা ও অপরিসীম ক্ষমতার জীবন্ত নিদর্শন। এ দৃশ্য মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, এই মহাবিশ্ব কোনো আকস্মিক ঘটনার ফল নয়; বরং সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও প্রজ্ঞাময় স্রষ্টার সুপরিকল্পিত সৃষ্টি।
একই সত্য অন্য আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরায় যা তারা অতিক্রম করতে পারে না’ (সুরা আর-রহমান : ১৯-২০)। এই আয়াত শুধু প্রকৃতির একটি বিস্ময়কর দৃশ্যের বর্ণনা নয়; বরং মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে।
আল্লাহ যেমন মিঠা ও লোনাপানির মাঝে সীমারেখা নির্ধারণ করেছেন, তেমনি মানুষের জীবনেও তিনি হালাল ও হারাম, ন্যায় ও অন্যায়, সত্য ও মিথ্যা, পবিত্রতা ও অপবিত্রতার মধ্যে সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই সীমারেখাকে ‘হুদুদুল্লাহ’ বা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা বলে। প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে না। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সব ক্ষেত্রেই এই সীমারেখা রক্ষা করলেই প্রতিষ্ঠিত হয় ভারসাম্য, শান্তি ও কল্যাণ।
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে উৎসাহিত করেছেন। প্রকৃতির প্রতিটি নিদর্শন একজন চিন্তাশীল মানুষকে স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। যখন একজন মুমিন বান্দা নদী, সমুদ্র, বৃষ্টি, পাহাড় কিংবা বিস্তীর্ণ আকাশের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকায়, তখন তার হৃদয় আল্লাহর স্মরণে আলোকিত হয়ে ওঠে এবং তাঁর প্রতি বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও ঈমান আরও দৃঢ় হয়।
মিঠা ও লোনা পানির মাঝের অদৃশ্য অন্তরায় শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি মহান আল্লাহর কুদরত, প্রজ্ঞা ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এই নিদর্শন আমাদের শিক্ষা দেয়, যিনি তাঁর আদেশে সাগরের পানির বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনিই মানুষের জীবনের জন্য সর্বোত্তম বিধান নির্ধারণ করেছেন। তাই প্রকৃত সফলতা নিহিত রয়েছে তাঁর কুদরতের নিদর্শনগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণে, তাঁর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলায় এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে