আত্মশুদ্ধি মুমিন জীবনের মূলমন্ত্র

মুফতি আশিকুল্লাহ বিন আসাদ

ইসলাম

মানুষের জীবনের সফলতা সাধারণত অর্থ, খ্যাতি, পদমর্যাদা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু বাহ্যিক এসব অর্জন

2026-08-15T08:36:41+00:00
2026-08-15T08:36:41+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
আত্মশুদ্ধি মুমিন জীবনের মূলমন্ত্র
মুফতি আশিকুল্লাহ বিন আসাদ
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের জীবনের সফলতা সাধারণত অর্থ, খ্যাতি, পদমর্যাদা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু বাহ্যিক এসব অর্জন থাকলেও যদি মানুষের অন্তর কলুষিত থাকে, চরিত্র দুর্বল হয় এবং নৈতিকতা ভেঙে পড়ে, তবে সেই সফলতা প্রকৃত সফলতা নয়। মানুষের আসল পরিচয় তার বাহ্যিক সাজসজ্জা বা সম্পদের মধ্যে নয়; বরং তার অন্তর, চিন্তা, চরিত্র ও আচরণের মধ্যে। তাই আত্মশুদ্ধি কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের একটি অংশ নয়; এটি সফল, সুন্দর ও অর্থবহ জীবনের মূলমন্ত্র।

আত্মশুদ্ধি বলতে নিজের অন্তরকে হিংসা, অহংকার, লোভ, ক্রোধ, বিদ্বেষ, কপটতা, অশ্লীলতা ও অন্যায় প্রবণতা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা বোঝায়। একই সঙ্গে সত্যবাদিতা, বিনয়, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়বোধ, তাকওয়া, দয়া ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের নামই আত্মশুদ্ধি। ইসলামের ভাষায় একে বলা হয় ‘তাজকিয়াতুন নাফস’ নিজের নফস বা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা। 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সফল হয়েছে সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর ব্যর্থ হয়েছে সে, যে নিজেকে কলুষিত করেছে’ (সুরা শামস : ৯-১০)। এই আয়াতে সফলতা ও ব্যর্থতার একটি মৌলিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষ কত সম্পদ অর্জন করল, কত বড় পদে গেল কিংবা সমাজে কত পরিচিত হলো এসবই চূড়ান্ত সফলতার মাপকাঠি নয়। প্রকৃত সফল সেই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, অন্যায় থেকে দূরে থেকেছে এবং নিজের চরিত্রকে সুন্দর করেছে।

মানুষের ভেতরের দুর্বলতাই অনেক সময় তার জীবনের বড় ক্ষতির কারণ হয়। অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ করতে বাধা দেয়, হিংসা অন্যের ভালো দেখতে দেয় না, লোভ মানুষকে হারাম পথে টেনে নেয়, ক্রোধ সম্পর্ক নষ্ট করে এবং কপটতা মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে। একজন ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হলেও যদি তার আচরণে অসততা, প্রতারণা, নিষ্ঠুরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা থাকে, তবে সে ব্যক্তি সমাজের জন্য কল্যাণের বদলে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে। তা ভালো হলে পুরো শরীর ভালো হয়ে যায়, আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখো, তা হলো অন্তর।’ (মুসলিম : ১৫৯৯)

আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ হলো নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি করা। মানুষ ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলের পর অনুতপ্ত হওয়া, আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের গুণ। নিজের ভুলকে সবসময় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, সমালোচনা সহ্য করতে না পারা কিংবা নিজের দোষ ঢাকতে ব্যস্ত থাকা আত্মশুদ্ধির পথে বড় বাধা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর : ৩১)

আত্মশুদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। মানুষের অনেক ভালো কাজও মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে, যদি তা লোক দেখানো, প্রশংসা পাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে করা হয়। ইবাদত, দান, জ্ঞানচর্চা, সমাজসেবা কিংবা দাওয়াত সব কাজের পেছনে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত থাকা প্রয়োজন। কারণ বাহ্যিকভাবে কাজ যত বড়ই হোক, নিয়ত শুদ্ধ না হলে তার প্রকৃত মূল্য থাকে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কাজের ফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে।’ (সহিহ বুখারি : ১)

বর্তমান সময়ে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে বাহ্যিক প্রদর্শনকে অনেক সময় প্রকৃত যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নিজের সাফল্য, সৌন্দর্য, সম্পদ ও জনপ্রিয়তা প্রকাশে ব্যস্ত থাকে। এতে অনেকের মধ্যে অহংকার, হিংসা, তুলনা, হতাশা এবং আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে নিজের অন্তরকে সংযত রাখা, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হওয়া, নিজের নিয়ত শুদ্ধ রাখা এবং অহংকার থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।


আত্মশুদ্ধির জন্য নিয়মিত ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণ অপরিহার্য। সালাত মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা, বিনয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। কুরআন তেলাওয়াত মানুষের অন্তরকে নরম করে এবং সঠিক পথের দিশা দেয়। রোজা প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। দান-সদকা মানুষের লোভ কমায় এবং মানবিকতা বৃদ্ধি করে। জিকির ও দোয়া মানুষের অন্তরে প্রশান্তি সৃষ্টি করে। এসব ইবাদত কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলোর উদ্দেশ্য হলো মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত : ৪৫)

আত্মশুদ্ধির জন্য সৎসঙ্গও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ তার সঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভালো মানুষের সঙ্গে থাকলে ভালো কাজের আগ্রহ বাড়ে, আর অসৎ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে অন্যায়ের দিকে নিয়ে যায়। তাই বন্ধু নির্বাচন, সামাজিক পরিবেশ এবং অনলাইন জগতের সঙ্গেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। যে পরিবেশ মানুষকে আল্লাহভীরু, সত্যবাদী, দায়িত্বশীল ও চরিত্রবান হতে উৎসাহিত করে, সেই পরিবেশই আত্মশুদ্ধির সহায়ক।

নিজেকে পরিশুদ্ধ করার একটি কার্যকর উপায় হলো প্রতিদিন আত্মসমালোচনা করা। দিনের শেষে নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা যেতে পারে আজ আমি কারও সঙ্গে অন্যায় করেছি কি না, কাউকে কষ্ট দিয়েছি কি না, মিথ্যা বলেছি কি না, কারও প্রতি হিংসা অনুভব করেছি কি না, আমার সময় কোথায় ব্যয় করেছি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কী কাজ করেছি। এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সচেতন করে, ভুল ধরিয়ে দেয় এবং সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।

আত্মশুদ্ধি একদিনের কাজ নয়, এটি আজীবনের সাধনা। মানুষের অন্তরে প্রতিনিয়ত ভালো ও মন্দের লড়াই চলতে থাকে। তাই বারবার নিজেকে সংশোধন করতে হয়, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় এবং আল্লাহর সাহায্য চাইতে হয়। যে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতাকে চিনতে পারে এবং তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে, সে ধীরে ধীরে উন্নত চরিত্রের অধিকারী হয়।

সফল জীবন কেবল বাহ্যিক অর্জনের নাম নয়; সফল জীবন হলো এমন জীবন, যেখানে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, মানুষের উপকার করে, নিজের চরিত্রকে সুন্দর রাখে এবং মৃত্যুর পরও ভালো কাজের স্মৃতি রেখে যায়। আত্মশুদ্ধি মানুষকে এই সফলতার পথ দেখায়।

অতএব ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক উন্নতির জন্য আত্মশুদ্ধির বিকল্প নেই। আমাদের প্রয়োজন শুধু বাহ্যিক উন্নয়ন নয়, অন্তরের উন্নয়নও। সম্পদের সঙ্গে সততা, ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায়বোধ, জ্ঞানের সঙ্গে বিনয় এবং ইবাদতের সঙ্গে উত্তম চরিত্র যুক্ত না হলে মানুষের জীবন পূর্ণতা পায় না। তাই আসুন, আমরা প্রতিদিন নিজেকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করি। কারণ আত্মশুদ্ধিই সফল জীবনের মূলমন্ত্র, সুন্দর চরিত্রের ভিত্তি এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের পথ।


খতিব, মদীনাতুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্স, শ্রীপুর, গাজীপুর


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে


  বিষয়:   আত্মশুদ্ধি  মুমিন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: