পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতি ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তারা সম্মান, শক্তি ও নেতৃত্ব অর্জন করেছে। আর যে জাতি বিভক্ত হয়েছে, তারা দুর্বল হয়েছে, পরাধীন হয়েছে এবং ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। এই চিরন্তন সত্য মুসলিম উম্মাহর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানরা সংখ্যা, সম্পদ ও সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও নানা সংকটে জর্জরিত। এর অন্যতম বড় কারণ হলো বিভক্তি, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, হিংসা, বিদ্বেষ এবং অনৈক্য। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের হৃদয়কে একত্রিত করতে চায়। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের দৃঢ়ভাবে তাঁর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরতে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হতে নির্দেশ দিয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, একসময় মানুষের অন্তরে শত্রুতা ছিল, কিন্তু ইসলামের বরকতেই তাদের হৃদয়ে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। এই শিক্ষা প্রমাণ করে যে ইসলামের শক্তি কেবল ব্যক্তি ইবাদতে নয়; বরং একটি ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত ও পরস্পর সহানুভূতিশীল উম্মাহ গঠনের মধ্যেও নিহিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। শরীরের একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে যেমন পুরো শরীর ব্যথা অনুভব করে, তেমনি একজন মুসলমানের কষ্টে অন্য মুসলমানও ব্যথিত হবে এটাই ঈমানের দাবি। এই শিক্ষা আমাদের জানিয়ে দেয় যে, ইসলাম ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়; বরং সমষ্টিকেন্দ্রিক একটি জীবনব্যবস্থা।
ঐক্যের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের আগে আরব সমাজ গোত্রে গোত্রে বিভক্ত ছিল। সামান্য বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। কিন্তু ইসলাম তাদের হৃদয়কে একত্রিত করল। মুহাজির ও আনসারের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা মানব ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই ঐক্যের শক্তিতেই অল্প সময়ের মধ্যে ইসলামের আলো আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পৌঁছে যায়।
খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগেও ঐক্য ছিল মুসলিম শক্তির মূল ভিত্তি। ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং
নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের কারণে মুসলিম সমাজ দ্রুত উন্নতি লাভ করেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়েছে, তখনই তাদের শক্তি ক্ষয় হয়েছে এবং শত্রুরা সেই সুযোগ গ্রহণ করেছে।
বিভক্তির ভয়াবহ পরিণতি : বিভক্তি শুধু রাজনৈতিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে না; এটি মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে, পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। হিংসা, অহংকার, দলীয় গোঁড়ামি, ব্যক্তিপূজা এবং পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ এসবই ঐক্যের পথে বড় বাধা।
আজ আমরা অনেক সময় এমন বিষয় নিয়ে পরস্পরের বিরোধে জড়িয়ে পড়ি, যা ইসলামের মৌলিক বিষয় নয়। মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপ দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে হেয় করা, তুচ্ছ বিষয়ে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা এবং ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারা এসব আচরণ ইসলামের সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মৌলিক আকিদা ও দ্বীনের মূলনীতির ওপর দৃঢ় থাকতে হবে; একই সঙ্গে যেসব বিষয়ে গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদি মতভেদ রয়েছে, সেখানে শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে হবে।
ঐক্যের ভিত্তি কী : ইসলামে ঐক্য কোনো ব্যক্তি, দল, বংশ, ভাষা বা ভূখণ্ডের ভিত্তিতে নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্য এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যখন মুসলমানরা নিজেদের পরিচয়ের আগে ইসলামকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন প্রকৃত ঐক্য সৃষ্টি হয়। ঐক্য মানে সব বিষয়ে একই মত হওয়া নয়। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যেও অনেক ইজতিহাদি মতভেদ ছিল; কিন্তু সেই মতভেদ কখনো তাদের ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করেনি। তাঁরা একে অপরের প্রতি সম্মান বজায় রেখেছেন এবং উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটাই আমাদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ।
মতভেদ ও বিভেদ এক নয় : বর্তমান সময়ের একটি বড় সমস্যা হলো মতভেদকে বিভেদ মনে করা। অথচ ইসলামি ইতিহাসে বহু ফিকহি ও ইজতিহাদি মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু তা উম্মাহর ঐক্যের পথে অন্তরায় হয়নি। যেখানে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে আপসের সুযোগ নেই। কিন্তু যেসব বিষয়ে আলেমদের গ্রহণযোগ্য মতভেদ রয়েছে, সেখানে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও উত্তম চরিত্র প্রদর্শনই ইসলামের শিক্ষা।
ঐক্যের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা : ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বাধা সৃষ্টি করে- অহংকার ও আত্মগর্ব, হিংসা ও বিদ্বেষ, গিবত, অপবাদ ও কুৎসা, দলীয় সংকীর্ণতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বহীন বক্তব্য, যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার, ক্ষমার মানসিকতার অভাব। এসব থেকে মুক্ত না হলে প্রকৃত ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ব্যক্তি থেকে শুরু হোক ঐক্যের চর্চা : ঐক্য প্রতিষ্ঠা বড় কোনো সম্মেলন দিয়ে শুরু হয় না; বরং শুরু হয় একজন মানুষের হৃদয় থেকে। আমরা যদি পরিবারে, প্রতিবেশীর সঙ্গে, মসজিদে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে পরস্পরের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলি, তবে বৃহত্তর সমাজেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিজের মতের বাইরে অন্যের কথা ধৈর্য নিয়ে শোনা, ভুল বোঝাবুঝি দূর করা, ক্ষমা করতে শেখা এবং সালামের
সংস্কৃতি জোরদার করা এসব ছোট ছোট আমলও ঐক্যের ভিত্তি মজবুত করে।
আলেম ও নেতৃত্বের বিশেষ দায়িত্ব : সমাজের আলেম, ইমাম, খতিব ও শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বক্তব্য, আচরণ এবং পারস্পরিক সম্পর্ক সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে। তাই তাদের উচিত এমন ভাষা ও আচরণ পরিহার করা, যা মুসলমানদের মধ্যে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। মতভেদ থাকলেও তা যেন শালীনতা, প্রজ্ঞা ও ইসলামি আদবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একইভাবে সমাজের নেতৃত্বদানকারীদেরও উচিত বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ঐক্যের প্রয়োজন : আজ মুসলিম বিশ্বের বহু অঞ্চল যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি, ইসলামবিদ্বেষ ও নানামুখী সংকটের মুখোমুখি। এ অবস্থায় নিজেদের মধ্যে সংঘাত বাড়ানো নয়; বরং শিক্ষা, গবেষণা, মানবসেবা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং নৈতিক পুনর্জাগরণের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের অপরিহার্য দাবি।
ঐক্য মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়, বরং ন্যায়ের ওপর একত্রিত হওয়া। কুরআন আমাদের সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে এবং অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা না করতে শিক্ষা দেয়। এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই মুসলিম ঐক্যের প্রকৃত ভিত্তি। মনে রাখতে হবে, ঐক্য মুসলিম উম্মাহর শক্তি, আর বিভক্তি তার দুর্বলতা।
ইতিহাসের প্রতিটি গৌরবময় অধ্যায় আমাদের শেখায়- যখন মুসলমানরা আল্লাহর নির্দেশ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখন তারা জ্ঞান, ন্যায়, সভ্যতা ও মানবকল্যাণে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর যখন তারা অহংকার, স্বার্থপরতা ও বিভক্তির পথে হেঁটেছে, তখনই তাদের শক্তি ক্ষয় হয়েছে।
আজ আমাদের প্রয়োজন পরস্পরকে প্রতিপক্ষ নয়, ভাই হিসেবে দেখা; মতভেদকে শত্রুতায় নয়, প্রজ্ঞা ও শালীনতার মাধ্যমে মোকাবিলা করা; কুরআন ও সুন্নাহকে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা এবং উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে হৃদয়ের বিভেদ দূর করি, পরস্পরের জন্য দোয়া করি, ন্যায় ও তাকওয়ার ওপর সহযোগিতা করি এবং এমন একটি সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি, যেখানে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী, মর্যাদাবান ও ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ গড়ে ওঠে। কারণ সত্যিকারের ঐক্যই উম্মাহর বিজয়ের চাবিকাঠি।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ
সময়ের আলো/এসএকে