স্মার্টফোনের পর্দায় এখন কুরআনের আয়াত, হাদিস, ওয়াজ, ইসলামি বক্তব্য ও ধর্মীয় নানা বার্তা কয়েক সেকেন্ডেই পৌঁছে যায় লাখো মানুষের কাছে। জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার এই সুযোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো যা দ্রুত ছড়াচ্ছে, তা কি সত্যও? ধর্মীয় কনটেন্টের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও বেশি জরুরি।
কারণ ভুল তথ্য শুধু বিভ্রান্ত করে না; কখনো তা মানুষের বিশ্বাস, আমল ও অন্যের প্রতি আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইসলাম তথ্য গ্রহণে যাচাইকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, কোনো অবিশ্বস্ত ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তা যাচাই করতে, যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে পরে অনুতপ্ত হতে না হয় (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ৬)। এই আয়াতের শিক্ষা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও প্রাসঙ্গিক, বিশেষত যখন একটি পোস্ট, স্ক্রিনশট বা ছোট ভিডিও মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
ধর্মীয় কনটেন্টের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো ‘অর্ধসত্য’। একটি আয়াত বা হাদিসের একটি অংশ তুলে ধরে তার প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া, দুর্বল বা জাল বর্ণনাকে সহিহ হিসেবে প্রচার করা কিংবা ব্যক্তিগত মতকে ইসলামের চূড়ান্ত বিধান হিসেবে উপস্থাপন করা, এসবের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার বদলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণাতেও আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমে কুরআনের আয়াত প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
হাদিসের ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন আরও গভীর। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে মিথ্যা আরোপ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। সেখানে তাঁর প্রতি মিথ্যা আরোপ না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১)। ফলে ‘শেয়ার করলেই সওয়াব’ এমন ধারণায় যাচাইহীন ধর্মীয় বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
তবে সোশ্যাল মিডিয়াকে শুধু বিভ্রান্তির মাধ্যম হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্য, কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা, ইসলামি ইতিহাস ও নৈতিক শিক্ষার মানসম্মত কনটেন্ট মানুষের জ্ঞানার্জনের সুযোগ বাড়াতে পারে। সমস্যা মাধ্যমটিতে নয়; সমস্যা হলো কনটেন্ট নির্বাচন, উৎস যাচাই এবং বোঝার পদ্ধতিতে।
তাই কোনো ধর্মীয় পোস্ট দেখলেই ‘শেয়ার’ করার আগে কয়েকটি প্রশ্ন করা জরুরি— আয়াত বা হাদিসের সঠিক সূত্র আছে কি? বক্তব্যটি প্রেক্ষাপটসহ উপস্থাপিত হয়েছে কি? এটি কি স্বীকৃত আলেম বা নির্ভরযোগ্য ইসলামি গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? সন্দেহ থাকলে শেয়ার না করাই নিরাপদ।
ইসলাম জ্ঞানের প্রচারকে উৎসাহিত করে, কিন্তু জ্ঞানের নামে অনুমান, গুজব বা মিথ্যা প্রচারকে নয়। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় কনটেন্টের যুগে আমাদের প্রয়োজন শুধু বেশি পোস্ট নয়; বেশি যাচাই, বেশি দায়িত্ববোধ এবং বেশি জ্ঞান।
কারণ ধর্মের নামে বলা প্রতিটি কথা কেবল একটি ‘কনটেন্ট’ নয়; তা মানুষের বিশ্বাস ও জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। জ্ঞান ছড়ানোর আগে সত্য নিশ্চিত করাই হোক ডিজিটাল দাওয়াহর প্রথম শর্ত।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে