একজন মুসলিম নারীর ধারাবাহিক সুশৃঙ্খল জীবনের অন্যতম শক্তি হলো নিয়মিত সালাত আদায়, রমজানের ফরজ ও অন্যান্য নফল সিয়াম পালন এবং কুরআন তেলাওয়াত করা। অন্তরের প্রশান্তি আনয়ন এবং জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য এই মৌলিক ইবাদতের গুরুত্ব বর্ণনাতীত। কারণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে কেবল আমারই ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি’ (সুরা যারিয়াত : ৫৬)। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে ইবাদতের ব্যাপারে রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।
‘হায়েজ’ বা ঋতুস্রাব নারীদেহের প্রজননতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়া। প্রতি মাসের নির্ধারিত সময়ে একজন নারীর শারীরিক কিছু পরিবর্তনের প্রভাবে জরায়ু থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়, যার স্থায়িত্ব সর্বনিম্ন তিন দিন থেকে সর্বোচ্চ দশ দিন। আর এই সময়ে শারীরিক অপবিত্রতার দরুন মৌলিক ইবাদত থেকে দূরে থাকার নিষেধ রয়েছে। যেমন হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর রসুল (সা.) বলেছেন, হায়েজ শুরু হলে সালাত ছেড়ে দেবে আর হায়েজ শেষ হলে গোসল করে সালাত আদায় করবে’ (বুখারী : ৩২০)।
কুরআন তেলাওয়াতের নিষেধের ব্যাপারে বলা হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ঋতুস্রাবগ্রস্ত নারী এবং গোসল ফরজ হওয়া ব্যক্তি যেন কুরআনের কোনো অংশই তেলাওয়াত না করে’ (ইবনে মাজাহ : ৫৯৫)। এ ছাড়া সিয়াম পালনে বিরত থাকার ব্যাপারেও নির্দেশনা রয়েছে।
তবে দীর্ঘ একটা সময় সালাত, কুরআন, সিয়াম থেকে দূরে থাকার ফলে মুসলিম নারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে দেখা যায়।
আল্লাহর একনিষ্ঠ এবং মুত্তাকি নারী নিজেদের আমলের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু যারা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ঈমানকে আঁকড়ে ধরে জীবনের গতি বজায় রাখার চেষ্টা করছেন তাদের জন্য এ সময়টা অনেক সংকটাপন্ন হয়ে থাকে। হায়েজ অবস্থায় তাদের অধিকাংশের মধ্যে একটা গা-ছাড়া ভাব চলে আসার কারণে স্বাভাবিক গতি থেকে ছিটকে পড়ে এবং সব ইবাদত থেকেই গাফিল হয়।
এমনকি অনেকের মাঝে স্বেচ্ছাচারী মনোভাব অর্থাৎ যা মন চায় তা করার ন্যায় এমন একটা পরিবর্তন চলে আসে। অনেকে মনে করেন, এই সময়ে যেহেতু সালাত নেই, কুরআন নেই, সিয়াম নেই তাই সংযমেরও কোনো প্রয়োজন নেই- এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।
কারণ একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটা সেকেন্ড গনিমতের মালের চেয়েও অধিক মূল্যবান। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের শারীরিক সুস্থতার জন্য আমাদের যেমন প্রতিবেলার খাবার নিশ্চিত করা জরুরি ঠিক তেমনই আমাদের অন্তরের সুস্থতার জন্য সেটার প্রয়োজনীয় খাবার নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কুরআনে এসেছে, ‘জেনে রাখো, কেবল আল্লাহর স্মরণেই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়’ (সুরা রাদ : ১৮)।
কাজেই এ সময়ে বেশি বেশি আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকা উচিত। আর হায়েজ অবস্থায় যেহেতু আল্লাহর হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে অন্তরের শক্তির প্রধান উৎসগুলো থেকে সাময়িক দূরে থাকতে হয় তাই ইবাদতের বিকল্প দিকের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হতে হবে।
প্রথমত কুরআনের বাংলা অনুবাদ ও তাফসির অধ্যয়ন করা, তেলাওয়াত বা স্পর্শ না করেও বেশি সময় নিয়ে কুরআনের তাদাব্বুর করতে পারি। অতঃপর যে সুরার তাফসির পড়ব সেটার অথবা পছন্দের সুরার অডিও তেলাওয়াত শুনতে পারি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো এবং নীরব থাকো যাতে তোমাদের প্রতি রহমত করা হয়’ (সুরা আরাফ : ২০৪)।
দ্বিতীয়ত টার্গেট নিয়ে অধিক পরিমাণে দরুদ ও ইসতিগফার পাঠ অর্থাৎ সার্বক্ষণিক জিকিরে জবানকে ব্যস্ত রাখা। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যার তসবিগুলো কোনোভাবেই যেন ছুটে না যায় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় আমার পবিত্রতা ঘোষণা করো’ (সুরা বাকারা : ১৫২)।
তৃতীয়ত হায়েজ অবস্থায় হাদিস অধ্যয়নের প্রতি মনোযোগী হওয়া। রিয়াদুস সালেহীন বা মিশকাতুল মাসাবিহ থেকে দৈনন্দিনের দরকারি হাদিসের অধ্যায়গুলো পাঠ করা। এ ছাড়া ইসলামি সাহিত্য পড়ার এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যাতে দ্বীনের মৌলিক থেকে শুরু করে গভীর বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা যায়।
সর্বোপরি সালাতের ওয়াক্তে একটু সময় নিয়ে বেশি বেশি দোয়া করা যাতে করে হায়েজ অবস্থাতেও রবের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যায়। পরিশেষে, ‘হায়েজ’ একজন নারীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত, এটি প্রজনন স্বাস্থ্য, হরমোনের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক সুস্থতার একটি স্বাভাবিক নির্দেশক।
তবে মৌলিক ইবাদত থেকে দূরে থেকে আল্লাহর আদেশ পালন করার পাশাপাশি ইবাদতের ব্যাপারে একেবারে গাফিল না হয়ে বরং নির্ধারিত সীমানায় থেকে আমলের ভারসাম্য রক্ষা রাখা। যাতে গুনাহ থেকে দূরে থেকে অন্তরের প্রশান্তি, ধীরস্থিরতা নিয়ে জীবনের স্বাভাবিক গতি বজায় থাকে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও