প্রতিদিন পাঁচবার মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ধ্বনিত আজানের সুর বিশ্ববাসীর কানে কেবল নামাজের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং মুমিনের মৃতপ্রায় হৃদয়ে নতুন করে ঈমানের জীবন্ত স্পন্দন ও জাগরণ তৈরি করে। ইসলামের সূচনালগ্নে কীভাবে এই সুমহান আহ্বানের প্রচলন হয়েছিল, তার পেছনে রয়েছে এক চমৎকার ইতিহাস ও আসমানি হিকমা। মদিনায় হিজরতের পর মুসলিমরা নিয়মিত একত্রিত হতেন, কিন্তু সালাতের সঠিক সময় জানানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যম বা পদ্ধতি ছিল না।
নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থের অভিন্ন বিবরণে পাওয়া যায়- একদিন এ বিষয়ে সাহাবিদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলে কেউ খ্রিস্টানদের মতো ঘণ্টা বাজানোর, কেউ অগ্নিপূজকদের মতো আগুন জ্বালানোর, কেউ ইহুদিদের মতো শিঙা ফুঁকার কিংবা পতাকা উড়িয়ে মানুষকে একত্রিত করার প্রস্তাব দিলেন। তখন হজরত ওমর (রা.) একটি সুন্দর পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘সালাতের জন্য একজন লোক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হোক, যে নামাজের সময় ঘোষণা করবে।’ এরপর প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হজরত বিলাল (রা.)-কে উদ্দেশ করে নির্দেশ দিলেন, ‘হে বিলাল, ওঠো এবং সালাতের ঘোষণা দাও।’ (সহিহ বুখারি : ৫৭৯)।
প্রাথমিক এই আলোচনার পর বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ বিন আবদে রাব্বিহি (রা.) বাড়ি ফিরে এক অদ্ভুত ও বরকতময় স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে তিনি দেখতে পান এক ব্যক্তি হাতে একটি ঘণ্টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তখন আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ (রা.) তাকে বললেন, ‘হে আল্লাহর বান্দা, আপনি কি ঘণ্টাটি বিক্রি করবেন?’ তিনি জানতে চাইলেন, ‘তুমি এটি দিয়ে কী করবে?’
উত্তরে সাহাবি বললেন, ‘আমরা এটি দিয়ে সালাতের জন্য আহ্বান জানাব।’ তখন সেই ব্যক্তি বললেন, ‘আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম কোনো জিনিসের কথা বলে দেব না?’ সাহাবি জানতে চাইলেন, ‘তা আবার কী?’ তখন তিনি আজানের চমৎকার ও সুমধুর শব্দাবলি তাঁকে শিখিয়ে দিলেন।
পরদিন সকালে তিনি প্রিয়নবী (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে পুরো স্বপ্নের বিবরণ শোনালেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে বিলাল, ওঠো, দেখো আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ কী বলে এবং তুমি তাঁর অনুসরণ করো।’ অতঃপর হজরত বিলাল (রা.) সেই শব্দগুলো দিয়ে প্রথম আজান দিলেন (ইবনে মাজাহ : ৫৮০)।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, বিলালের মুখে আজানের এই সুর শুনে হজরত ওমর (রা.) দৌড়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে হাজির হলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! যিনি আপনাকে সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন, তাঁর কসম! সে যেরূপ স্বপ্ন দেখেছে, আমিও অবিকল সে রকমই দেখেছি।’ বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসুল (সা.) শুকরিয়া আদায় করে বললেন, ‘সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।’ (সুনান আবু দাউদ : ৪৯৯)।
আজানের সুমধুর ধ্বনির রয়েছে এক অলৌকিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি। হাদিসের বিবরণ থেকে জানা যায়, মুয়াজ্জিন যখন আজান দিতে শুরু করেন, তখন আজানের আওয়াজ যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, সেই সুদূর বিস্তার এলাকা ছেড়ে শয়তান পলায়ন করে। আজানের পবিত্র সুর মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে এবং মনকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে ধাবিত করে।
আজান কেবল একটি শব্দমালা বা ধ্বনি নয়, এটি হচ্ছে তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা এবং মুমিনের আত্মিক মুক্তির প্রতীক। কোলাহলপূর্ণ এই দুনিয়ায় প্রতিদিন পাঁচবার আজানের সুর যখন আমাদের কানে এসে পৌঁছায়, তখন তা আমাদের অন্তরে আল্লাহর স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সব পাপাচার থেকে দূরে থাকার বার্তা দেয়। তাই আজানের সম্মান রক্ষা করা এবং এর আদব বজায় রেখে সালাতের প্রস্তুতি নেওয়া প্রতিটি মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও