নামাজ ইসলামের অন্যতম মূল ভিত্তি। এটি শুধু ইবাদতের একটি রূপ নয়, বরং এটি মানুষের জীবনযাপনের একটি আদর্শ নিয়ম। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মানে সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ ছাড়া নামাজ আমাদের শারীরিক সুস্থতার জন্যও উপকারী। নামাজের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঠিক ব্যায়াম হয়। মানসিক শান্তি, ধৈর্য এবং আত্মবিশ্বাসের বিকাশে নামাজের ভূমিকা অপরিসীম। নামাজ মানুষকে তার জীবনের সব বিষয়ের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে শেখায় এবং একই সঙ্গে তার চারপাশের সবকিছুর প্রতি দয়া ও সহানুভূতির মনোভাব তৈরি করে। এর ফলে ব্যক্তি জীবনে যেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তেমনই সমাজজীবনে সম্প্রীতি ও সহযোগিতার আবহ তৈরি হয়।
পুরুষদের জন্য জামাতে নামাজ আদায় করার ওপর অনেক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জামাতে নামাজ আদায় করা তথা মসজিদে গিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়ার গুরুত্ব আরও ব্যাপক। জামাতে নামাজ পড়ার মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজের জীবনে যে পরিবর্তন আসে, তা অসাধারণ। পবিত্র কুরআনের আয়াত থেকে জামাতে নামাজ পড়ার গুরুত্ব ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, আর তোমরা নামাজ কায়েম করো ও জাকাত দাও এবং আর যারা রুকু দেয় তাদের সঙ্গে রুকু দাও (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৩)। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘যদি লোকেরা জানত আজান ও প্রথম কাতারের সওয়াব সম্পর্কে এবং তাদের যেতেও হতো হামাগুড়ি দিয়ে, তবু তারা আসত।’ (বুখারি ও মুসলিম)
নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করতে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একা নামাজ পড়ার চেয়ে জামাতে নামাজ আদায় করার গুরুত্ব অনেক বেশি। জামাতে নামাজ আদায় করা আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। এটি ইহকালীন ও পরকালীন উভয় জগতের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জামাতে নামাজ আদায় করা একাকী নামাজ আদায় করার চেয়ে ২৭ গুণ বেশি সওয়াবের’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৫)। রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজের জন্য পরিপূর্ণরূপে ওজু করে কোনো ফরজ নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে যায় এবং তা লোকদের সঙ্গে অর্থাৎ জামাতসহকারে অথবা মসজিদে পড়ে, আল্লাহ তার গুনাহগুলো মাফ করে দেন’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩২)।
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজর ও এশার নামাজ জামাতে আদায় করে, সে যেন পুরো রাত ইবাদত করল’ (মুসলিম)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ওজু করে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করে, তার প্রতিটি কদমের বিনিময়ে একেকটি পাপ মাফ হয় এবং একেকটি কদমের জন্য একটি উচ্চ মর্যাদা লাভ করে। (মুসলিম)
জামাতে নামাজের ফলে দুনিয়ায় ধনী-গরিব সবাই এক হয়ে মিশে যায়। একই নামাজের সারিতে রাজা-প্রজা একত্রে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে। ইমাম যদি কুৎসিতও হয় বা নিম্নশ্রেণির মানুষও হয় তবু তার পেছনে সবাই একত্রিত হবে নামাজের জন্য। আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘হে আবু জর, যদি কালো কুৎসিত এবং এবড়োখেবড়ো মাথাবিশিষ্ট হাবশিও তোমাদের ইমাম হয় তবু তার আনুগত্য করবে’ (বাইহাকি)। জামাতে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে সব কাজে ইমামের অনুসরণ করতে হবে এবং তার চেয়ে অগ্রবর্তী হওয়া যাবে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘অনুসরণ করার জন্যই ইমাম নির্ধারণ করা হয়। কাজেই তার বিরুদ্ধাচরণ করবে না। তিনি যখন রুকু করেন তখন তোমরাও রুকু করবে।’ (মেশকাত)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। যুদ্ধ কি শান্তি, সুস্থ কি অসুস্থ সবাই ওয়াফতের পূর্বে মৃত্যুব্যাধিতে আক্রান্ত অবস্থায়ও তিনি সালাত আদায়ে বিন্দুমাত্র অবহেলা করেননি। যুদ্ধের মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহ জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ার তাগিদ দিয়েছেন।
মহানবী (সা.) জামাতে নামাজ আদায়ে গাফিলতির ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আজান শুনল এবং তার কোনো অপারগতা না থাকা সত্ত্বেও জামাতে উপস্থিত হলো না, তার সালাত হবে না’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৯৩)। যারা নামাজের জামাতে মসজিদে হাজির হয় না, মহানবী (সা.) তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। জামাত পরিত্যাগকারীর প্রতি সতর্ক করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ করে বলছি, আমার ইচ্ছা হয় আমি কাঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দিই আর নামাজের আজান দেওয়ার জন্য হুকুম দিই। এরপর আমি এক ব্যক্তিকে হুকুম করি, যেন সে লোকদের নামাজের ইমামতি করে। আর আমি ওই লোকদের দিকে যাই, যারা নামাজের জামাতে হাজির হয়নি এবং তাদের বাড়িঘরগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিই।’ (বুখারি)
জামাত মানে সংঘবদ্ধতা। এতে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় বর্ণ-বৈষম্যের সব প্রাচীর। একাকার হয় সব জাত-পাত। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজার কোনো ভেদাভেদ থাকে না। ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধের মহান আদর্শের অভিব্যক্তি ঘটে এই জামাতে। জামাতে উপস্থিত হয়ে অজ্ঞ ব্যক্তি ইসলামি জ্ঞান লাভ করতে পারে। দরিদ্র সাহায্য পেতে পারে। ঐক্যের মহামিলন দেখে মুসলিমের হৃদয় নরম হয়। প্রকাশ পায় ইসলামি সমতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা। বিনা ওজরে কোনো পুরুষের জামাত ব্যতীত নামাজ আদায় উচিত নয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে