টানা বর্ষণের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই অনেক সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও এতটাই পানি জমছে যে রাস্তার গর্ত, ভাঙা অংশ কিংবা খোলা ম্যানহোল চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনের তাগিদে অনেককেই ঘরের বাইরে বের হতে হয়। তবে সামান্য অসাবধানতাও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই জলাবদ্ধ এলাকায় চলাচলের সময় কিছু বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন।
ধীরে চলুন, পানির গভীরতা বুঝে পা ফেলুন
বৃষ্টির পানি জমে গেলে পরিচিত সড়কও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কোথায় গর্ত, কোথায় রাস্তা ভেঙে গেছে বা কোথায় ম্যানহোলের ঢাকনা নেই—এসব পানির নিচে বোঝা যায় না। তাই দ্রুত হাঁটার পরিবর্তে ধীরে ধীরে এগোন এবং পা ফেলার আগে জায়গাটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন। আশপাশের মানুষ যে পথ দিয়ে নিরাপদে চলাচল করছেন, সম্ভব হলে সেই পথ অনুসরণ করুন। পানির স্রোত বেশি থাকলে বা গভীরতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে সেখানে না নামাই ভালো।
বৈদ্যুতিক ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকুন
জলাবদ্ধতার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই রাস্তার পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি, ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক বক্স কিংবা ছিঁড়ে পড়া তারের কাছাকাছি যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। পানিতে কোনো তার পড়ে থাকতে দেখলে সেটি সরানোর চেষ্টা করবেন না। বিষয়টি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান এবং আশপাশের মানুষকে সতর্ক করুন।
খোলা ম্যানহোল বড় বিপদের কারণ হতে পারে
প্রবল বৃষ্টির সময় অনেক জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা সরে যেতে পারে বা পানির নিচে ঢেকে যায়। ফলে বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না। তাই অতিরিক্ত পানি জমে থাকা এলাকায় একা হাঁটার সময় আরও সতর্ক থাকুন। সামনে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখুন এবং অজানা পথে চলাচল এড়িয়ে চলুন। শিশুদের কখনোই এমন রাস্তায় একা যেতে দেবেন না।
সাপের উপদ্রবের আশঙ্কাও থাকে
বন্যা বা জলাবদ্ধতার সময় সাপ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়ির উঠান, গ্যারেজ, সিঁড়ির নিচে কিংবা ঝোপঝাড়ে আশ্রয় নিতে পারে। তাই এসব জায়গায় চলাচলের সময় সতর্ক থাকুন। রাতে বাইরে বের হলে টর্চ বা পর্যাপ্ত আলো ব্যবহার করুন। জুতা পরার আগে ভেতরে কিছু আছে কি না তা দেখে নেওয়া ভালো। সাপে কামড়ালে ঝাড়ফুঁক বা ওঝার শরণাপন্ন না হয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
যানবাহন নিয়ে ঝুঁকি নেবেন না
সামনের কোনো বড় গাড়ি সহজে পার হয়ে যাচ্ছে দেখে নিজের ছোট গাড়ি বা মোটরসাইকেল নিয়ে একই পথে নামা ঠিক নয়। বড় গাড়ি ও ছোট যানবাহনের সক্ষমতা এক নয়। পানির গভীরতা না বুঝে এগোলে গাড়ি বিকল হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে। মোটরসাইকেল চালকদের ক্ষেত্রে পানির নিচে থাকা গর্ত বা ভাঙা রাস্তার কারণে ভারসাম্য হারানোর আশঙ্কা আরও বেশি।
খালি পায়ে হাঁটা নিরাপদ নয়
অনেকে জুতা ভিজে যাওয়ার ভয়ে খালি পায়ে পানি পার হন। কিন্তু পানির নিচে কাচ, পেরেক, ধাতব বস্তু বা অন্য ধারালো জিনিস থাকতে পারে, যা গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে। তাই এমন জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করুন, যা পায়ে শক্তভাবে আটকানো থাকে এবং ভিজলেও ব্যবহারযোগ্য থাকে।
শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর দিন
জমে থাকা পানি শিশুদের কাছে খেলার জায়গা মনে হলেও সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের পানি জমে থাকা স্থানে খেলতে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে বয়স্কদের একা চলাচল করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পিচ্ছিল রাস্তা বা পানির নিচে থাকা গর্তে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সম্ভব হলে তাদের সঙ্গে একজন সহযাত্রী রাখুন।
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদে রাখুন
মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক কার্ড, ওষুধ বা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সাধারণ ব্যাগে রাখলে সেগুলো ভিজে নষ্ট হতে পারে। তাই এসব জিনিস জলরোধী ব্যাগ, জিপ-লক পাউচ বা প্লাস্টিকের ফোল্ডারে সংরক্ষণ করুন।
বাসায় ফিরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
জলাবদ্ধ পানিতে নর্দমার ময়লা, ব্যাকটেরিয়া ও বিভিন্ন জীবাণু থাকতে পারে। তাই বাইরে থেকে ফিরে শুধু কাপড় বদলালেই হবে না। সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত-পা এবং শরীরের পানির সংস্পর্শে আসা অংশ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। পায়ে কোনো ক্ষত থাকলে সেটি পরিষ্কার করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রয়োজন না হলে বাইরে না যাওয়াই ভালো
সব সময় জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাই অতিরিক্ত বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার সময় সম্ভব হলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। বাইরে যাওয়ার আগে পরিচিত কারও কাছ থেকে রাস্তার অবস্থা জেনে নিন অথবা স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে বের হন।
বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা আমাদের পরিচিত বাস্তবতা হলেও এর ঝুঁকি কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সচেতনতা, ধৈর্য এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করলে দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ