টাইফুন বাভির প্রভাবে চীনের বিভিন্ন প্রদেশে প্রবল বৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। পানির তোড়ে অনেক এলাকায় গাড়ি ভেসে যাচ্ছে, রাস্তাঘাট ডুবে গেছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব চীনের বিভিন্ন এলাকায় টাইফুন বাভির কারণে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে অনেক স্কুল, নির্মাণ প্রকল্প ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। বন্যার পানিতে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক মানুষ আটকা পড়েছেন।
লিয়াওনিং প্রদেশের রাজধানী শেনইয়াংয়ে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে। ১৩ জুলাই সকালে শহরের বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে কিছু বাস রুট ও মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। কিন্ডারগার্টেন থেকে জুনিয়র হাইস্কুল পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ছুটি ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি নির্মাণকাজ ও খোলা স্থানে চলমান কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। শহরের ৯৪টি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্মীদের ঘরে থেকে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে বলেছে। উদ্ধার ও বন্যা মোকাবিলায় ১২টি সরকারি সংস্থার ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি কর্মী কাজ করছেন।
হেবেই প্রদেশের চেংদে শহরে বন্যার পানিতে বহু গাড়ি ভেসে গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টির কারণে প্রায় ৯টি গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ১২ জুলাই রাত পর্যন্ত বৃষ্টিপাত চলতে থাকায় অনেক আবাসিক এলাকা পানিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
চেংদে শহর চলতি বছর এর আগেও চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়েছে। জুন মাসে সেখানে শিলাবৃষ্টি ও ভারী বৃষ্টির কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তখন অনেক বাসিন্দাকে ঘর থেকে বের হতে বরফ, কাদা ও জমে থাকা পানি সরাতে হয়েছিল।
এদিকে মধ্য চীনের আনহুই প্রদেশে ১২ জুলাই ৬১ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির আশঙ্কায় বিভিন্ন পার্ক বন্ধ রাখা হয়েছে এবং জলাধারের ওপর চাপ কমাতে আগাম পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র ১৩ জুলাই সকালে টাইফুন বাভির জন্য নীল সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির চার স্তরের সতর্কতা ব্যবস্থায় এটি সর্বনিম্ন স্তর। আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, টাইফুনটি ঘণ্টায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে উত্তর দিকে এগিয়ে পরে উত্তর-পূর্ব দিকে মোড় নেবে এবং ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে শানডং প্রদেশ হয়ে হলুদ সাগরের দিকে প্রবেশ করবে।
উদ্ধারকাজে মানুষের পাশাপাশি ড্রোন ও ড্রাগন বোট
বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধারকাজে সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছে। দক্ষিণ চীনের কিছু এলাকায় মানুষ একে অপরকে সহায়তা করতে ফ্রিজের মতো সামগ্রী ভাসমান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে পানির মধ্যে চলাচল করেছে।
বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন বোটও এবার উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
গুয়াংশি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের গুইয়াং শহরের একটি গ্রামের ড্রাগন বোট দলের সদস্যরা ১২ মিটার দীর্ঘ একটি নৌকা ব্যবহার করে ২০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করেছেন। এই দলটি জুন মাসের প্রতিযোগিতার জন্য তিন মাস ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে প্রতিযোগিতা বাতিল হয়। পরে সেই নৌকাই মানুষের জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
উদ্ধারকারীরা জানান, বন্যার পানিতে নৌকা চালানো প্রতিযোগিতার চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। প্রবল স্রোতের মধ্যে চারজন মিলে নৌকা নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ধারকাজ চালান। উদ্ধার করা মানুষের মধ্যে ছিল ২১ দিন বয়সী এক শিশু, একজন বৃদ্ধ এবং গাছে আশ্রয় নেওয়া এক শিশুও।
বৃষ্টির মধ্যে ড্রোন পরিচালনাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। পানির কারণে ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ হারালে গাছ, বিদ্যুতের তার বা মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকিও রয়েছে।
বন্যায় ৩৯ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ৯
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই বন্যায় এখন পর্যন্ত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলে বাসিন্দারা ঘরে ফিরে কাদা পরিষ্কার, ক্ষতিগ্রস্ত জিনিসপত্র উদ্ধার এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শুরু করেছেন। অনেক গ্রামের বাড়িঘর ভেসে গেছে, গবাদিপশু মারা গেছে, গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
গুয়াংশির আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই বাড়ি ছাড়ার সময় কোনো মালপত্র নিতে পারেননি। শুধু পরনের কয়েকটি কাপড় নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছেছেন তারা।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, এবারের বন্যার অন্যতম বড় সমস্যা হলো পানি কমতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। একটি উদ্ধারকারী দলের প্রধান ওয়াং ই জানান, গুইগাং এলাকায় উদ্ধারকাজের সময় তিনি একদিনের মধ্যে পানির স্তর প্রায় ২০ সেন্টিমিটার বাড়তে দেখেছেন।
তার মতে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গ্রামে পানির গভীরতা প্রায় ৮ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। উদ্ধারকারীরা নৌকা নিয়ে চলার সময় রাস্তার সাইনবোর্ড ও নজরদারি ক্যামেরা পর্যন্ত স্পর্শ করতে পেরেছেন।
উদ্ধারকারীরা আরও জানান, পানির নিচে কাদা, পেরেক, লোহার খুঁটি ও ধারালো বস্তু থাকায় অভিযান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব কারণে অনেক উদ্ধার নৌকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ