গাজায় ইসরাইলের চলমান গণহত্যা ও সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে তার ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের প্রভাবে ইসরাইলের সাধারণ মানুষের মানসিক জীবন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এরই এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে এক গবেষণায়। এখন ইসরাইলের প্রতি চারজন নাগরিকের মধ্যে একজন কোনো না কোনো ক্ষতিকর মাদক সেবন করছে। ইসরাইলের প্রখ্যাত সংবাদপত্র হারেৎজের প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইল অ্যাডিকশন ও মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে মাদক ব্যবহারের এই ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়েছে। সে সময় হামাসের আক্রমণের পর ইসরাইল গাজায় যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এর আগে করোনা মহামারির আগে ইসরাইলে মাত্র ১০ জনে একজন মাদক সেবন করত। মহামারির সময় তা বেড়ে ৭ জনে একজন হয়েছিল। আর ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এই হার প্রায় ২৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে অর্থাৎ প্রতি চারজনে একজন।
বিশেষ করে ঘুমের ওষুধ বা প্রশান্তিদায়ক ওষুধের ব্যবহার আড়াই গুণ বেড়ে গেছে। আফিমজাতীয় ও উদ্দীপক পদার্থের ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ ছাড়া গাঁজা ও অ্যালকোহলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যারা যুদ্ধের ঘটনা দেখে মানসিক আঘাত বা ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’-এ ভুগছেন, তাদের মধ্যে মাদকাসক্তির হার এখন ৫৪.২ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি।
কেন এমন হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর শাউলি লেভ-রান বলছেন, বারবার সংকটের মুখোমুখি হয়ে চরম চাপের মধ্যে বসবাস করার কারণে মানুষ মাদকেই ভরসা করছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যত বেশি চাপ বাড়ছে তত বেশি মানুষ এ পথে ঝুঁকছে। আর একবার অভ্যাস তৈরি হলে তা থেকে আর কখনো ফেরা সম্ভব হয় না; চাপ কিছুটা কমলেও মাদক সেবন চলতেই থাকে।
ইসরাইলি সাধারণ মানুষের বিবরণে উঠে এসেছে কীভাবে কেটামিন, কোকেন, অ্যামফিটামিন, গাঁজা ও প্রেসক্রিপশনের ওষুধ এখন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের হুঁশিয়ারি, কারও মৃত্যুর খবর, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ এসব ভয় আর যন্ত্রণা ভুলে থাকার জন্যই তারা এই পথ বেছে নিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরাইলি বলেন, সারা দিন শুধু রক্ত আর মৃত্যুর খবর শুনি। নিজেকে এসব থেকে দূরে রাখার জন্যই আমি এখন মাদকের ওপর নির্ভর করি। অনেকে বলছেন যে, তারা বম্ব শেল্টারে যাওয়ার আগে কেটামিন সেবন করেন। আবার কেউ কেউ রাতে ঘুমাতে না পারার যন্ত্রণা ভুলতে আর কাজে মনোযোগী হতে উদ্দীপক পদার্থ খাচ্ছেন। এমনকি মৃত্যুর শোকসভাতেও অনেকে অ্যামফিটামিন সেবন করছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এটা আর কেবল রাতের বিনোদন বা পানশালার বিষয় নয়। বাড়িতে, অফিসে, পানশালা, এমনকি পাবলিক বম্ব শেল্টারেও এখন মাদক সেবন সাধারণ ঘটনা। অনলাইনে গোপন যোগাযোগ ও ডিজিটাল পেমেন্টের সুবাদে আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে মাদক সংগ্রহ করা।
মাদকের ক্ষতি নিরসনে কাজ করা ড. রয় জুকার বলছেন, হাসপাতালে যারা মাদকজনিত কারণে জরুরি অবস্থায় আসছেন, তাদের ৮০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মাদক মিশিয়ে সেবন করার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যা অনেক বেশি মারাত্মক ও প্রাণঘাতী।
এই সংকট শুধু ইহুদি নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ফিলিস্তিনিরাও পিছিয়ে নেই। তারা একদিকে গাজায় নিজেদের পরিবার ও স্বজনদের গণহত্যা দেখছেন, অন্যদিকে নিজেদের দেশেও ক্রমশ নির্যাতন ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছেন। একজন ফিলিস্তিনি বলেন, গাজায় মৃত্যু দেখে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। মানসিক চিকিৎসা পাওয়া যায় না, সামর্থ্যও নেই তাই অনেকে বাধ্য হয়ে মাদকের পথে পা বাড়াচ্ছেন।
প্রফেসর লেভ-রান শেষে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, যতদিন যুদ্ধ চলবে, যতদিন দেশজুড়ে সতর্কতার সংকেত বাজতে থাকবে, ততদিন এই মাদকাসক্তি ও মানসিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। দীর্ঘদিন ধরে এখানকার মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। দৈবক্রমে ফিরলেও ফিরতে না ফিরতেই আবার নতুন হামলা, নতুন সেনা প্রেরণ বা নতুন যুদ্ধের ঘোষণা আসে।
এই অবস্থায় মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। স্পষ্টতই, যুদ্ধের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্র বা সীমান্তের বাইরে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি পুরো জাতির মানসিক ও সামাজিক ভবিষ্যৎকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি