বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। ভৌগোলিক কারণে বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশে নতুন কিছু নয়। তবে যেকোনো দুর্যোগ যখন জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন একজন মুমিনের দায়িত্ব ও কর্তব্য বহুগুণ বেড়ে যায়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মানবজীবনের প্রতিটি সংকট সমাধানে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। বন্যা বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ইসলামের নির্দেশনা মূলত দুটি স্তরে বিন্যস্ত- প্রথমটি আধ্যাত্মিক বা আত্মিক সংশোধন এবং দ্বিতীয়টি মানবিক বা সামাজিক দায়িত্ব পালন।
ইসলামের দৃষ্টিতে মেঘ, বৃষ্টি, বাতাস ও পানি- সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টি এবং তারই হুকুমে পরিচালিত হয়। পানি যেমন জীবনের আধার, তেমনি আল্লাহর হুকুমে এটি মানুষের পরীক্ষা বা শাস্তির কারণও হতে পারে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি বাতাস পাঠান, অতঃপর তা মেঘমালাকে চালিত করে; তারপর তিনি মেঘমালাকে আকাশে যেমন ইচ্ছা ছড়িয়ে দেন এবং তা খণ্ড-বিখণ্ড করেন, অতঃপর তুমি দেখতে পাও তার মধ্য থেকে বৃষ্টিধারা নির্গত হয়...’ (সুরা রুম, আয়াত : ৪৮)।
অতএব বন্যা বা দুর্যোগের সময় মানুষের প্রথম কাজ হলো নিজের অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব স্বীকার করে আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ করা। অহংকার বা উদাসীনতা পরিহার করে আল্লাহমুখী হওয়া। যেকোনো সংকটে মুমিনের প্রধান অস্ত্র হলো দোয়া ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। দুর্যোগের সময় অনুনয়-বিনয় না করাকে ইসলামে অন্তরের কঠিনতার লক্ষণ বলা হয়েছে। সুরা আনআমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর যখন তাদের কাছে আমার (পক্ষ হতে) সংকট আসল, তখন তারা কেন অনুনয়-বিনয় করল না? বরং তাদের অন্তর আরও কঠিন হয়ে গেল এবং তারা যা করছিল, শয়তান তা তাদের কাছে শোভনীয় করে দিল’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৪৩)। তাই বন্যা পরিস্থিতিতে বেশি বেশি তওবা, ইসফিগফার এবং আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার মাধ্যমে আত্মিক সংশোধন জরুরি।
ইসলামে মানবসেবাকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বন্যায় যখন মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদিপশু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো সমাজের সামর্থ্যবানদের ওপর ধর্মীয় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ালে আল্লাহর সাহায্য অবধারিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬৬০৮)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একই হাদিসে আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি সংকটগুলোর মধ্য থেকে একটি সংকট দূর করে দেবে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার কঠিন সংকটগুলোর একটি সংকট দূর করে দেবেন’। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬৬০৮)
ইসলামের মানবিক শিক্ষার সৌন্দর্য এখানেই যে, তা দ্বীন ও ঈমানের ক্ষেত্রে যেমন অনমনীয়, তেমনি বিপদগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে সীমানাহীন। বন্যায় আক্রান্ত মানুষটি কোন ধর্মের বা কোন দলের- তা দেখার বিষয় নয়। ক্ষুধার্ত ও বিপদগ্রস্তদের সেবা করাই ইসলামের মূল কথা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তা হলে আসমানের মালিক (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং : ৪৯৬৯)। অমুসলিম প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে যাওয়া এবং তাকে সাহায্য করার মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের এক মহান সুযোগ তৈরি হয়, যা সৃষ্টির প্রতি দয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমাদের দেশের দ্বীনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) এবং দ্বীনি ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক এবং স্বেচ্ছাসেবী অনেক সংগঠন বরাবরই সামর্থ্য অনুযায়ী দুর্যোগে মানুষের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইসলামের শিক্ষা হলো, এই দান-সদকা হতে হবে কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, লোক দেখানো বা প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের আহার্য দান করে। (এবং বলে) আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাদের আহার্য দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করি না’। (সুরা আদ-দাহর, আয়াত : ৮-৯)
বন্যার তাৎক্ষণিক ত্রাণের চেয়েও বড় প্রয়োজন হলো বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন করা। ঘরবাড়ি মেরামত, চিকিৎসাসেবা, কৃষি উপকরণ বিতরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। সমাজে এমন অনেক বিত্তবান মানুষ আছেন, যাদের একক প্রচেষ্টায় শত শত পরিবারের ভাগ্য পুনর্গঠন সম্ভব।
সম্মিলিতভাবে সবাই এগিয়ে এলে দেশের যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করা সহজ হয়ে যায়। বন্যা আমাদের জন্য একদিকে যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, অন্যদিকে সামর্থ্যবানদের জন্য মানবসেবার মাধ্যমে বিপুল সওয়াব অর্জনের এক মহা সুযোগ। আসুন দলমত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই বন্যাদুর্গত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই।
শিক্ষার্থী, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী
সময়ের আলো/আআ