সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের দমনপীড়নে রক্তাক্ত এক অধ্যায় পেরিয়ে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৩৬ দিন আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের জুলাই শহিদ এবং আহত ব্যক্তিদের জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জুলাই শহিদদের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তখন সংখ্যাটি ছিল ৮৩৪। এরপর জুন মাসে আরও ১০ জনের নাম যুক্ত হলে জুলাই শহিদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪। তাদের তালিকার গেজেটও প্রকাশিত হয়। তবে এই সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। একেক জায়গায় একেক রকম হিসাব। সরকার হিসাব দিচ্ছে একরকম; সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখ থেকে আসছে ভিন্নরকম। আবার নানা দল ও সংগঠনের কাছ থেকে আসছে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা।
এমন পরিস্থিতিতে আজ ১৬ জুলাই যথাযোগ্য মর্যাদায় সারা দেশে পালিত হচ্ছে ‘জুলাই শহিদ দিবস’। এই দিনে রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা তার সেই মুহূর্ত আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর দেশজুড়ে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়ে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে গড়ায়। জুলাই শহিদ দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জুলাই শহিদ পরিবারের মর্যাদা নিশ্চিত এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
জুলাই শহিদের সংখ্যা বাড়তে পারে : সরকারি গেজেট, জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন, জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের হিসাব সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের অমিল। একই সঙ্গে নতুন করে তদন্তে গণকবর, বেওয়ারিশ মরদেহ ও নদীতে মরদেহ ভাসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জুলাই শহিদদের তালিকা বিতর্কমুক্ত নয়। বিভিন্ন মহল অভিযোগ তুলেছে, আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন এমন কিছু ব্যক্তি তালিকায় স্থান পেয়েছেন। আবার প্রকৃত শহিদদের কেউ কেউ এখনও তালিকার বাইরে রয়েছেন। একটি অনুসন্ধানে তালিকাভুক্ত অন্তত ৫২ জনের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে; এসব তথ্য এখনও যাচাই করছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
সরকার অনুমোদিত জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে শহিদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। হোমপেজে বলা হয়েছে, শহিদের সংখ্যা ‘৮২০ জনের বেশি’। তবে একই ওয়েবসাইটের তালিকায় রয়েছে ৮৪৫ জনের নাম। অন্যদিকে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ গত বছর প্রকাশিত তালিকায় শহিদের সংখ্যা ৯১৪ বলে অজানা বহু মৃত্যুর গল্প দাবি করে। সংগঠনটির ভাষ্য ছিল, তাদের কাছে আরও ৬০০ জনের বেশি সম্ভাব্য শহিদের তথ্য রয়েছে, যা তখনও যাচাই চলছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ শহিদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, শিশু ও নারীসহ ‘সহস্রাধিক’ নিরস্ত্র মানুষ নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রকাশিত ‘২য় স্বাধীনতায় শহিদ যারা’ শীর্ষক স্মারক গ্রন্থে ৭১৬ জনের নাম রয়েছে। তবে গ্রন্থের ভূমিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই তালিকা পূর্ণাঙ্গ নয়। সম্প্রতি দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন। প্রতিবেদনে বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ হতে পারে।
এই সংখ্যা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কেও গুরুত্ব পায়। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, শহিদ ও আহতদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে সফল হয়নি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একই প্রশ্ন তুলে বলেন, জাতিসংঘের হিসাব, সরকারি তালিকা ও বিভিন্ন ঘোষণাপত্রের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। তার মতে, প্রকৃত তালিকা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
জুলাই গণহত্যার তদন্তে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার একটি হাসপাতাল থেকে নিহত ব্যক্তিদের কিছু মরদেহ পাশের নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অনেক হাসপাতাল নিহতদের মরদেহ রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত না করে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা অন্যভাবে সরিয়ে ফেলার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জুরাইন, নারায়ণগঞ্জ, মাতুয়াইল ও মুন্সীগঞ্জের সম্ভাব্য গণকবরও তদন্তের আওতায় রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৮৬৫টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। যেগুলো এখনও শনাক্ত হয়নি, সেগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, গণকবর, নিখোঁজ মরদেহ এবং নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া মরদেহের তথ্য একত্রিত হলে নিহতের সংখ্যা জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রায় ১,৪০০ ছাড়িয়েও যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের তালিকায় এ পর্যন্ত সরকারি গেজেটে ৮৬৫ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে এর বাইরেও বহু মরদেহ গণকবর ও নদীতে পাওয়া গেছে, যা এখনও তালিকায় যুক্ত হয়নি। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাইয়ে গণকবর দেওয়া হয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করার কাজ চলছে। গণকবরে যাদের দাফন করা হয়েছে, তারা গেজেটে এখনও যুক্ত হননি। এ ছাড়া একটি হাসপাতাল থেকে নদীতেও অনেক মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়েছে, তাদেরও পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। গণকবর ও নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া বাকি শহিদদের শনাক্তের কাজ শেষ হলে মোট শহিদের সংখ্যা এক হাজার ৪০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মামলা ১৮৫৫
বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে সংঘটিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় দেশে মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা করা হয়েছে। দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ৭৯৯টি সরাসরি হত্যা মামলা এবং বাকি ১ হাজার ৫৬টি অন্যান্য আইনি ধারায় করা হয়েছে। মামলাগুলোর অগ্রগতি খুব মন্থর। ১৫৮টি মামলার তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি হত্যা মামলা এবং ১১০টি অন্যান্য মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং এসব মামলার বিচার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ১৮৫৫টি মামলার মধ্যে ১৫৮টি মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে হত্যা মামলা ৪৮টি এবং অন্যান্য মামলা ১১০টি। বাকি ১ হাজার ৬৯৭টি মামলার তদন্ত চলমান। তিনি এই বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া হলেও দ্রুততম সময়ে প্রতিবেদন দাখিলের লক্ষ্যে পুলিশ বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যাতে বিচারের সময় কোনো আইনি দুর্বলতা না থাকে।
সময়ের আলো/জেডআই