২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলো। দেশের রাজপথ তখন স্লোগানে মুখর, আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে ছাত্র-জনতার উত্তাল মিছিলে। স্বৈরাচারের বুলেট আর অমানবিক নির্যাতনের মুখেও দমে যায়নি এ দেশের দামাল ছেলে ও মেয়েরা। সেই দিনগুলোতে বুক চিতিয়ে লড়েছিল অকুতোভয় আবু সাঈদসহ শত শত ছাত্র-জনতা। তাদের সেই রক্তিম আত্মত্যাগেই আজ আমরা পেয়েছি নতুন দিনের আলো, পেয়েছি মুক্ত শ্বাস। আজ সেই বীর সন্তানদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও অসীম কৃতজ্ঞতা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অবিনশ্বর হয়ে আছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। ১৬ জুলাই রংপুরের পার্ক মোড়ে পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে তার বুক পেতে দেওয়ার সেই দৃশ্য কেবল একটি মৃত্যুই ছিল না, তা ছিল স্বৈরাচারের মসনদ কাঁপিয়ে দেওয়া এক বজ্রকঠিন হুংকার। আবু সাঈদের সেই আত্মত্যাগ পুরো জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিল, যা শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে ধসিয়ে দিয়েছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের দুঃশাসনের দেওয়াল।
আবু সাঈদের পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবে প্রাণ দিয়েছেন অন্তত ৮৪৩ জন বীর সন্তান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিংবা রাজধানীর অলিগলিতে স্বৈরাচারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছে অনেকের শরীর। তাদের প্রত্যেকেরই স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জনবান্ধব রাষ্ট্র। তাদের রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা আজ আমাদের পরম প্রাপ্তি।
আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ সংক্রান্ত মামলার রায় দেওয়া হলেও, দ্রুত সময়ের মধ্যে তা কার্যকর করা প্রয়োজন। শহীদ পরিবারের সদস্যদের আর্তনাদ আর আহাজারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত বিপ্লবের প্রকৃত স্বাদ অধরাই থেকে যাবে।
শহীদদের ত্যাগ যেন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে হতে হবে আরও উদ্যোগী। আবু সাঈদসহ সকল শহীদের স্মৃতিসংরক্ষণে গৃহীত প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং তাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠছে সর্বত্র। একই সঙ্গে, যারা এই আন্দোলনে আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে।
সময়ের আলো/কহু