কয়েক ঘণ্টার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা যেভাবে বদলে দিল তুরস্কের রাজনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের রাতটি তুরস্কের ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজধানী আঙ্কারা ও বৃহত্তম শহর ইস্তানবুলে ট্যাংক,

2026-07-16T18:31:14+00:00
2026-07-16T18:31:14+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
কয়েক ঘণ্টার ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা যেভাবে বদলে দিল তুরস্কের রাজনীতি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৬:৩১ পিএম 
সংসদীয় শাসনব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় তুরস্কের রূপান্তরের ফলে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন। ছবি : ডয়েচে ভেলে
২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের রাতটি তুরস্কের ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজধানী আঙ্কারা ও বৃহত্তম শহর ইস্তানবুলে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, গোলাগুলি এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার হতে থাকে। অতীতে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থাকা দেশটির জন্যও এমন পরিস্থিতি ছিল অভূতপূর্ব। 

প্রথমবারের মতো তুরস্কের সংসদ ভবনে হামলা চালানো হয় এবং ইস্তানবুলের বসফরাস সেতু, যা বর্তমানে ‘১৫ জুলাই শহীদ সেতু’ নামে পরিচিত— রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সাক্ষী হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান মোবাইল ফোনের ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে টেলিভিশনে হাজির হয়ে জনগণকে রাস্তায় নেমে অভ্যুত্থান প্রতিহত করার আহ্বান জানান। দেশের বিভিন্ন মসজিদ থেকেও লাউডস্পিকারে একই বার্তা প্রচার করা হয়।

ভোর হওয়ার আগেই সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সরকারি হিসাবে, ওই ঘটনায় ২৫৩ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ১৮৪ জন ছিলেন সাধারণ নাগরিক এবং ৩৪ জন ছিলেন কথিত অভ্যুত্থানকারী। মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হলেও এই ঘটনা পরবর্তী এক দশকে তুরস্কের রাজনৈতিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। 

অভ্যুত্থানের পর নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান 

সরকার অভিযোগ তোলে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইসলামি ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারীরাই অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী। যদিও ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গুলেন এই অভিযোগ অস্বীকার করে গেছেন।  

ঘটনার পরপরই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল এবং কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ সময় তুরস্কের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা অভিযান পরিচালিত হয়।

হাজার হাজার সেনা কর্মকর্তা, বিচারক, প্রসিকিউটর, পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা এবং সরকারি কর্মচারীকে গ্রেপ্তার, বরখাস্ত কিংবা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গুলেনপন্থি বলে অভিযুক্ত শত শত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সরকারের দাবি ছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে গুলেনপন্থি নেটওয়ার্ক নির্মূল করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই অভিযান ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিরোধী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করার হাতিয়ারেও পরিণত হয়।

প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণ

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০১৭ সালের গণভোটে অল্প ব্যবধানে সাংবিধানিক সংশোধনী পাস হয়, যার মাধ্যমে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। পরের বছর তা কার্যকর হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করা হয়।

সমর্থকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়েছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং সংসদের কার্যকর ভূমিকা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।

গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউজও বলেছে, নতুন ব্যবস্থায় আইনপ্রণেতাদের নীতিনির্ধারণী ভূমিকা দুর্বল হয়েছে এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ

অভ্যুত্থানচেষ্টার পর বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। হাজার হাজার বিচারক ও প্রসিকিউটরকে অপসারণের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান।

বিশ্লেষকদের মতে, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন কমে আসে এবং প্রশাসন আরও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যায়। একই সঙ্গে জনসমাবেশ আয়োজন কঠিন হয়ে ওঠে, বিরোধী মতের ওপর বিধিনিষেধ বাড়ে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়।

২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১৬৩তম।

এদিকে প্রেসিডেন্টকে অপমানের অভিযোগে সাংবাদিক, রাজনীতিক ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালে ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মামলাটি এখনও বিচারাধীন। একই সময়ে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির নেতৃত্ব নিয়েও আদালতের হস্তক্ষেপকে বিরোধীরা ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যা দেয়।

তবে সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, অভ্যুত্থানের পর গৃহীত পদক্ষেপগুলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত করার জন্যই নেওয়া হয়েছে।


রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাবের অবসান

দীর্ঘদিন ধরে তুরস্কের সেনাবাহিনী নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করত এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু ২০১৬ সালের ঘটনার পর ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে দৃঢ়ভাবে বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

সামরিক একাডেমি ও হাসপাতাল পুনর্গঠন, নিয়োগব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং শহরাঞ্চল থেকে সামরিক ইউনিট সরিয়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এসব সংস্কারের ফলে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের যুগ কার্যত শেষ হয়েছে।

নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রনীতির উত্থান

অভ্যুত্থানচেষ্টার পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতেও নিরাপত্তা বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। আঙ্কারা উত্তর সিরিয়ায় একাধিক সামরিক অভিযান চালায়, যার লক্ষ্য ছিল ইসলামিক স্টেট এবং ওয়াইপিজি।

একই সময়ে নেটোর সদস্য হয়েও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে এবং এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান প্রকল্প থেকে দেশটিকে বাদ দেয়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিলেও বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার তুরস্কের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাও স্থবির হয়ে আছে। ২০১৮ সালের পর থেকে এ বিষয়ে কার্যত কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

সব মিলিয়ে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান শুধু একটি সংকটের সমাপ্তি নয়, বরং তুরস্কের রাজনৈতিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সেনাবাহিনীর ভূমিকা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের সূচনা করে।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ



  বিষয়:   তুরস্ক  রাজনীতি  অভ্যুত্থান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: