ইসরায়েলি নির্যাতন ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্নার লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

জার্মান মানবাধিকারকর্মী ২৫ বছর বয়সি আন্না লিডকে গত শরতে দক্ষিণ ইতালি থেকে প্রায় একশত মানবাধিকার কর্মীর সঙ্গে একটি পুরোনো জাহাজে

2026-07-17T03:09:46+00:00
2026-07-17T03:09:46+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইসরায়েলি নির্যাতন ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্নার লড়াই
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৯ এএম 
আন্না লিড। ছবি : সংগৃহীত
জার্মান মানবাধিকারকর্মী ২৫ বছর বয়সি আন্না লিডকে গত শরতে দক্ষিণ ইতালি থেকে প্রায় একশত মানবাধিকার কর্মীর সঙ্গে একটি পুরোনো জাহাজে চড়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। যাত্রা শুরুর আগে আগের নৌবহরের সদস্যরা তাকে সতর্ক করেছিলেন ইসরায়েলি হেফাজতে কেমন আচরণ হতে পারে, যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি কতটা বেশি।

আন্না নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছিলেন, পরে তিনি বলবেন, কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছিল তার জন্য কোনো প্রস্তুতি কখনোই যথেষ্ট হতে পারে না। ‘আপনি আগেই জানেন তারা কী করতে পারে, নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন ঘটনাটি সামনে আসে, মনে হয় যেন আপনি কিছুই জানতেন না। কারণ আপনি কখনো জানতে পারবেন না, সেই মুহূর্তে আপনার নিজের শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।’

সেই যাত্রার ৮ অক্টোবর ভোর সাড়ে চারটায় জাহাজের ক্যাপ্টেনের চিৎকারে তার ঘুম ভেঙে গেল। ‘এটা কোনো মহড়া না, ইসরায়েলিরা আসছে।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই ইসরায়েলি কমান্ডোরা জাহাজে উঠে এসব কর্মীকে ক্যান্টিনে একত্রিত করে জাহাজটিকে ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় বন্দরে পৌঁছানোর পর আন্নাকে প্রথমবারের মতো আইনি প্রক্রিয়ার নামে এক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন জার্মান ভাষা জানা ব্যক্তি তাকে ‘নাৎসি পতিতা’ বলে গালি দেয়। ঠিক তার কয়েক মিনিট পরই তাকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে তল্লাশি দেওয়া শুরু হয়- এটি ছিল তার প্রথম যৌন নিপীড়নের শুরু।

ইসরায়েলের আইনে স্পষ্ট নিয়ম আছে, কোনো আটককে নগ্ন করে তল্লাশি করার আগে তার সুস্পষ্ট সম্মতি নিতে হবে। সম্মতি না পেলে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অনুমোদন দিতে হবে, তল্লাশিটি হবে শুধু দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণ, কোনো শারীরিক স্পর্শ নয় এবং সবসময় একটি সম্পূর্ণ বন্ধ কক্ষে, শুধু একই লিঙ্গের কর্মীদের উপস্থিতিতে। আন্না কখনোই সম্মতি দেননি। তবু তাকে এমন একটি স্থানে কাপড় খুলতে বাধ্য করা হয়, যা শুধু আংশিকভাবে একটি পর্দা দিয়ে আড়াল করা ছিল। পাশের করিডোর দিয়ে পুরুষ সৈন্যরা হেঁটে যাওয়ার সময় সরাসরি তার দিকে তাকিয়েছিলেন, তার নগ্ন দেহ দেখতে পাচ্ছিলেন।

তারপর তাকে দ্রুত বহিষ্কারের কাগজে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। আন্না মানেননি। কারণ সেই কাগজে লেখা ছিল তিনি অবৈধভাবে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছেন, যেখানে বাস্তবে তাকে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে জোরপূর্বক এখানে আনা হয়েছিল। সেই রাতেই তার চোখে কাপড় বেঁধে এবং হাতে হাতকড়া পরিয়ে তাকে কেতজিওত কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার সম্মতি ছাড়াই দ্বিতীয়বার সম্পূর্ণ নগ্ন করে তল্লাশি করা হয়। ‘আমি তাদের বলেছিলাম, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই তারা আমাকে তল্লাশি করেছে- আবার কেন, তারা কিছুই বলেননি। যারা সম্মতি দিয়েছিল, তাদের শুধু বাইরের কাপড় খুলতে হয়েছিল। আর আমার মতো অসম্মতিদাতাদের পুরোপুরি নগ্ন করা হয়েছিল।’

সেই রাত কোনোভাবেই কাটছিল না। আন্নাকে একটি নোংরা কক্ষে রাখা হয়, যেখানে বিশুদ্ধ পানীয় জলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সারা রাত উচ্চশব্দে গান বাজানো, বারবার কক্ষের তল্লাশি এবং অনুসন্ধানী কুকুরের ব্যবহারের কারণে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে দেওয়া হয়নি। কারাগারের অন্য কোণ থেকে বারবার কারাবন্দিদের চিৎকার ও কাঁদার শব্দ আসছিল। ১০ অক্টোবর তাকে আবার স্থানান্তর করা হয়। এবার গিভন কারাগারে। সেই স্থানেই ঘটে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা, যা তাকে আজও ভেতর থেকে ভেঙে ফেলে।

আন্না জানান, গিভন কারাগারে তাকে আবারও এমন একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যা শুধু আংশিকভাবে পর্দা দিয়ে আড়াল করা ছিল। তাকে কাপড় খুলতে নির্দেশ দেওয়া হয়। আন্না না মানলে দুই, পরে তিনজন নারী কারারক্ষী জোর করে তার সব পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন। তারা তাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে, তার দুই হাত এমনভাবে চেপে ধরে যেন কোনোভাবেই নড়াচড়া করতে না পারে। এরপর তাদের একজন তার যোনিতে  এবং পায়ুপথে আঙুল প্রবেশ করান। আন্না চিৎকার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অন্যজন তার মুখ চেপে ধরে ফেলেছিল, যাতে কোনো শব্দ বের হতে না পারে। ‘আমি বারবার বলছিলাম, আমি চাই না, আমাকে ব্যথা দেওয়া হচ্ছে- কিন্তু তারা কিছুই শুনছিল না।’

এই সব চলার সময় পাশ থেকে পুরুষ সেনাসদস্যদের হাসির শব্দ তার কানে পড়েছিল। পর্দাটি পুরোপুরি টানা ছিল না, তাই তারা পুরো ঘটনাটি খুব সহজেই দেখতে পাচ্ছিলেন। আন্নার দৃঢ়বিশ্বাস, সেই সময় কারও কারও হাতের ক্যামেরায় বা কারাগারের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ঘটনাটি সম্পূর্ণরূপে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে বিপুলসংখ্যক ক্যামেরা থাকে, আর এর আগেও বহু ক্ষেত্রে নির্যাতনের ভিডিও সরকারি বা ব্যক্তিগত হাতে থেকে প্রকাশ পেয়েছে।

১২ অক্টোবর পাঁচদিনের কারাবাস শেষে আন্না ও নৌবহরের অন্যান্য সদস্যদের জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়। এই সময়জুড়ে তিনি পুরোপুরি অনশনে ছিলেন। পরে তিনি বলবেন, সেই মুহূর্তে খাবারের চেয়ে একটি সিগারেটের প্রতিই তার বেশি তৃষ্ণা ছিল। জর্ডানের রাজধানী আম্মানের একটি হোটেলে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক ও মনোবিদরা তাদের সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময়ই আন্না তার এক সাংবাদিক বন্ধুকে বলেন, ‘তোমার প্রতিবেদনে অবশ্যই লিখবে যে, এখানে অন্তত একজন নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।’

জার্মানিতে ফিরে ডিসেম্বর মাসে রাজনৈতিক বন্দিদের নিয়ে একটি সম্মেলনে তিনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নিজের ওপর সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনাটি খুলে বলেন। নৌবহরের কোনো সদস্য এখনও প্রকাশ্যে এ ধরনের অভিযোগ তোলেননি। আন্না প্রথম। পরে তিনি আরও জানান, তার মতো আরও এক ডজনেরও বেশি ব্যক্তি ইসরায়েলি আটককেন্দ্রে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন- যারা এখনও নীরবতা ভাঙতে পারেননি।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে বলার পর আন্না ভয়ের বদলে এক অপ্রত্যাশিত শান্তি অনুভব করেছিলেন। ‘মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতরে বছরের পর বছর জমে থাকা একটি শক্ত গিঁট ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।’ তারপর নৌবহরের আরও কয়েকজন নারী তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তাদেরও ঠিক একই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। ইন্টারনেটে কেউ কেউ তার অভিজ্ঞতা নিয়ে তর্ক করেছেন, কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন নারী কর্মীদের হাতে সংঘটিত এই আঘাতকে সত্যিই ধর্ষণ বলা যায় কি না? কিন্তু আন্না কোনোভাবেই নিজের পথ থেকে সরেননি। ‘আমার লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা যখন নীরব থাকি, তখনই তারা আরেকজন নারীর সঙ্গেও ঠিক একই কাজ করার সাহস পায়।’

ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী সম্মতি ছাড়া যেকোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশকেই পুরোপুরি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ভিত্তিতে ইসরায়েলভিত্তিক ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা আদালাহের আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ আন্নার পক্ষে ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল, কারা কর্তৃপক্ষ, নির্যাতন তদন্তকারী বিভাগ ইয়াহাস এবং গিভন কারাগারের কমান্ডার- সবার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।

হাদ্দাদ বলেন, আন্নার লক্ষ্য শুধু ন্যায়বিচার পাওয়া নয়। আমরা চাই ইসরায়েলে কারাগারে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের এই দীর্ঘদিনের ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে একটি শক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি হোক। প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণ প্রায় রোজের ঘটনা হয়ে আসছে। এখন দেখা যাচ্ছে, যারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানাতে এসেছেন, বিদেশি নাগরিকরা- তাদের সঙ্গেও তারা এখন একই আচরণ করতে দ্বিধা করছেন না।

আন্নার এই অভিযোগ একা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের মে মাসে জাতিসংঘ সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতার অভিযুক্ত দেশগুলোর কালো তালিকায় ইসরায়েলের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি পুরুষ বন্দিদের ধর্ষণেরও বহু অভিযোগ পেয়েছে। এ মাসে ব্রিটেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের আটককেন্দ্রগুলোতে যৌন নিপীড়ন নিয়ে স্পষ্টভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ নৌবহরের সদস্যদের করা নির্যাতনের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে, ফ্রান্সের প্রসিকিউটররা তাদের নিজেদের নাগরিকদের ওপর হয়ে থাকা অমানবিক আচরণের অভিযোগে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।

আন্না এখনও ওই ঘটনার মানসিক চাপ বহন করছেন। কিছু দিন মনে হয় সবকিছু ভুলে গেছেন, আবার কিছু দিন মনে হয় কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু তিনি কখনোই পিছিয়ে যেতে চান না। গাজা নিয়ে কাজ করার রাজনৈতিক অঙ্গীকারই তাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি দিচ্ছে। গাজার উপকূলে তাদের নৌবহরের একটি জাহাজকে ঘিরে জনতার যে উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা তিনি দেখেছিলেন, সেই স্মৃতিই তাকে বলে দিচ্ছে- সহ্য করা সবকিছু শেষ পর্যন্ত সার্থক হবে। ‘যদি এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এমন আশা জাগানো যায় যে, পরবর্তী নৌবহর আবারও গাজার দিকে যাবে তা হলে আমার সব যন্ত্রণা, সবকিছুই পুরোপুরি সার্থক।’

সব শেষে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আন্নার সব অভিযোগকে একসঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মুখপাত্র বলেন, নির্যাতনের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আর ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘আমরা এই সব ভিত্তিহীন অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছি। আমাদের কর্মীরা কখনোই পরিকল্পিতভাবে কাউকে নির্যাতন করেন না, কখনোই ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন করেন না।’

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   ইসরায়েল  নির্যাতন  আন্না  লড়াই  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: