গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে গণমাধ্যম ও এর উদ্যোক্তাদের নিরাপদ রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর বসুন্ধরায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির মাধ্যমে হলেও গণমাধ্যম শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বাস্তবতায় প্রচলিত গণমাধ্যমকে টিকে থাকতে হলে নতুন জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং সময়োপযোগী আইনি কাঠামো গ্রহণ করতে হবে। পরিবর্তনের এ পর্যায়ে যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে অনেক সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসঙ্গ তুলে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমানে তথ্য গ্রহণের প্রধান উৎস হিসেবে ডিজিটাল মাধ্যম দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। ফলে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলো নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রায় সব বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকেই মাল্টিমিডিয়া কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হয়েছে এবং নতুন আয়ের উৎস খুঁজতে হচ্ছে। তাই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও জোরদার করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতাদের উত্থানের কারণে বিজ্ঞাপনের বড় একটি অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের ক্ষেত্রে পাঠক ও দর্শক সংখ্যাকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও টেকসই গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গণমাধ্যম সংস্কার, প্রয়োজনীয় কমিশন গঠন এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন ছাড়া সাংবাদিকদের সম্মানজনক বেতন, চাকরির স্থায়িত্ব ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে গণমাধ্যম উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। সাংবাদিকদের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর না হলে পেশাদার সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অপসাংবাদিকতার সুযোগ বাড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন, নিবন্ধিত সব গণমাধ্যমকে সরকারি বিজ্ঞাপনের আওতায় আনা, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন, সাংবাদিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ডেইলি সানের সম্পাদক রেজাউল করিম লোটাস বলেন, সরকার ইতোমধ্যে স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। এর প্রতিদানে সাংবাদিকদেরও দেশ ও জনগণের স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরাম অভিযোগ করেন, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের গণমাধ্যমগুলোর পাঠক ও দর্শক সংখ্যা বেশি হলেও সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র বরাদ্দে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি ডিএফপির বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা, সার্কুলেশনভিত্তিক বিজ্ঞাপন, সাংবাদিকদের পেনশন চালু এবং স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের দাবি জানান।
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে সরকারি বিজ্ঞাপন নীতিমালার আওতায় আনার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ. কে. এম. মনজুরুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন গণমাধ্যম নানা ধরনের বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম খান বলেন, সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা। একই সঙ্গে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাছির জামাল বলেন, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক কর্মরত রয়েছেন। সরকারের ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে ডেইলি সান, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম, নিউজ টোয়েন্টিফোরসহ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/আআ