নেই সেবা নেই নজরদারি

সমীরণ রায়

জাতীয়

নগর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো এক কথায় বেহাল দশায় পড়েছে। এসব কেন্দ্র নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। আর

2026-07-18T01:58:38+00:00
2026-07-18T01:58:38+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
নেই সেবা নেই নজরদারি
সমীরণ রায়
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৮ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
নগর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো এক কথায় বেহাল দশায় পড়েছে। এসব কেন্দ্র নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। আর এসব স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র সুচারুভাবে যাতে পরিচালিত হয়- সে জন্য কোনো নজরদারিও নেই। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন ওয়ার্ডে রয়েছে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তবে এসব অবকাঠামো নগরবাসীর কোনো কাজে আসছে না। রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতেই গড়ে তোলা হয়েছিল এসব অবকাঠামো। চলতি বছরের ২২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসব নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

পরদিন ২৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে সিভিল সার্জনদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবাকে এক ছাতার নিয়ে আসতে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো আত্তীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো এখন ধুঁকছে অবহেলায়। সংগত কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে ছোটেন। এতে যেমন স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়ছে, তেমনই বড় হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে।

রাজধানী ঢাকার প্রায় আড়াই কোটি নগরবাসীর প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিসের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৬টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩১টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেবা বিভাগের আওতায় হস্তান্তরের পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। 

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল প্রথম আশ্রয়স্থল। এই নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, সাধারণ রোগের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির মতো সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। পর্যাপ্ত জনবল সংকট, চিকিৎসক অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব, আধুনিক যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা ও দুর্বল তদারকির কারণে অধিকাংশ নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রই নগরবাসীর কোনো কোনো উপকারে আসছে না।

মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা : অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের প্রাক-প্রসব (এএনসি) ও প্রসবোত্তর (পিএনসি) চেকআপ এবং নিরাপদ প্রসব বা ডেলিভারি সেবা, গর্ভকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা : নামমাত্র মূল্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হওয়ার কথা। জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া ও অন্যান্য সাধারণ রোগের চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধও এসব কেন্দ্র থেকে দেওয়ার কথা। শিশুদের জন্য ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী নিয়মিত টিকাদান এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিটি টিকা প্রদানও এসব কেন্দ্রের কর্মসূচির অংশ। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত পরামর্শ এবং বিভিন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীÑ যেমন পিল, কনডম ও ইনজেকশন বিতরণও এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কাজ। অপুষ্টিতে ভোগা মা ও শিশুদের জন্য পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ ও সচেতনতামূলক সেবা কার্যক্রমগুলো এসব কেন্দ্রে সম্পন্ন হওয়ার কথা।

কিন্তু সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দেখা গেছে, দ্রুত বর্ধনশীল রাজধানী ঢাকার বেশিরভাগ কেন্দ্রেই রোগীর উপস্থিতি খুবই কম। কোথাও চিকিৎসক নেই। নেই নার্স। আবার চিকিসক ও নার্স থাকলেও নেই স্বাস্থ্যকর্মী। নির্ধারিত সময়ে তারা কেন্দ্রে উপস্থিত হন না। কয়েকটি কেন্দ্রে কেবল টিকাদান কিংবা পরিবার-পরিকল্পনার সীমিত কার্যক্রম চললেও সাধারণ চিকিৎসাসেবা কার্যত অনিয়মিত। অন্যদিকে এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রেরও রয়েছে সংকট। আবার অনেক কেন্দ্রে আধুনিক যন্ত্র থাকলেও নেই ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট। এক্সরে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের সংকট রয়েছে। অনেক কেন্দ্রের এক্স-রে এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনগুলো অকেজো। জনবল সংকট, ওষুধের অপ্রতুলতা এবং কার্যকর তদারকির অভাবে অনেক কেন্দ্রই প্রায় অচল।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী অনেক কম। কোথাও চিকিৎসকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য, কোথাও আবার একজন চিকিৎসককে একাধিক কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান রোগীরা। নার্স, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট এবং সহায়ক কর্মচারীর সংকটও রয়েছে। 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রতিটি জোনে ১০০-২০০ শয্যার হাসপাতাল, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, বিনামূল্যে মানসম্মত এসআরএইচআর সেবার জন্য নগরস্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বাজেট দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিশোরী ও নারীবান্ধব সেবা, ওষুধ ও পরীক্ষার খরচ কমানো, নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যবিমা এবং শক্তিশালী প্রশাসন ও সমন্বয় করা প্রয়োজন। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে রাজধানীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বড় একটি অংশ এখানেই সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগ যন্ত্রপাতিই অকেজো।

সাধারণ জ্বর, সর্দি, ব্যথা কিংবা রক্তচাপের ওষুধও পাওয়া যায় না এসব কেন্দ্রে। প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা না থাকায় রোগীদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়। 

প্রতি বছর নগর স্বাস্থ্যসেবা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও সেই বিনিয়োগের সদ্ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেবার মান সেই পর্যায়ে উন্নত হয়নি।

অন্যদিকে অনেক নগরবাসী জানেনই না যে তাদের ওয়ার্ডে একটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। ফলে জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কমিউনিটি সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করা গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার অনেক বাড়তে পারে। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনায় নিয়মিত মনিটরিংয়ের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। কার্যকর নজরদারি নেই বললেই চলে। সেবার মান মূল্যায়নে রোগীদের মতামত নেওয়ারও কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তবে ডিজিটাল উপস্থিতি, অনলাইন রিপোর্টিং এবং নিয়মিত অডিট চালু করা হলে সেবার মান অনেকটাই উন্নত হতে পারে। যেসব রোগ নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব, সেগুলোর জন্যও বড় হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় রোগীদের। এতে জরুরি রোগীদের সেবাও অনেক সময় ব্যাহত হয়।

সিপাহীবাগ এলাকার এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রহিমা বেগম বলেন, ডাক্তার পাব ভেবে এসেছিলাম। এসে শুনি ডাক্তার আসেননি। ওষুধও নেই। তাই আবার বাইরে গিয়ে চিকিৎসক দেখাতে হবে। 

খিলগাঁওয়ের এক বাসিন্দা বলেন, কয়েকবার এই কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রতিবারই হয় চিকিৎসক পাইনি, নয়তো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। তাদের এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন ভালো কাজ করে না। ফলে শেষ পর্যন্ত আমাকে বেসরকারি হাসপাতালেই যেতে হয়েছে।

ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, নগরস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও পরিকল্পনা অপরিহার্য। আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিস প্রজেক্টের সেবা প্রদানের মাধ্যমে দেখা গেছে, চিকিৎসক, মিডওয়াইফ, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ সুষম জনবল এবং বিনা মূল্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের বিশ্বাস ও সেবা গ্রহণ বৃদ্ধি করে। ফান্ডিং ও পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট জরুরি। জনগণকে সচেতন করা, সোশ্যাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু করা এবং রাজস্ব বরাদ্দ ও মন্ত্রণালয়ের সহায়তা মিলিয়ে ১ শতাংশের সাসটেইনেবল ফান্ড তৈরি করা যেতে পারে। অবকাঠামো শক্তিশালী করে, প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিটে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও মিডওয়াইফ নিয়োগে নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্থিতিশীল ও কার্যকর করা সম্ভব।

আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সাইদ রুবায়েত বলেন, বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে নগরস্বাস্থ্য নিয়ে এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হতে পারে। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর।মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয়, সরকারি বিনিয়োগ ও জিডিপির তুলনায় জনস্বাস্থ্য ব্যয় কমেছে। এর মধ্যে আরবান হেলথ আরও বেশি বঞ্চিত। নগর স্বাস্থ্যসেবা অনেকটা দাতা প্রকল্প, এনজিও, জেনারেল প্র্যাকটিশনার ও অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের খরচ বেড়েছে এবং অনেকেই দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থায় স্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী গড়ে ওঠেনি, বড় প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থাপনাও দুর্বল।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহান ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কীভাবে চালাবে তারা জানে। আমাদের এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   সেবা  নজরদারি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: