চাঁদাবাজদের বেপরোয়া তৎপরতায় নগরজুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যখন-তখন হোয়াটসঅ্যাপ কলে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে ব্যবসাযীদের। চাঁদবাজ গ্রুপের সদস্যদের গ্রেফতারের দাবি করা হলেও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অধরা। প্রতিবার সন্ত্র্রাসী হামলার পর আলোচনার ঝড় ওঠে। শীর্ষ সন্ত্রাসী গড ফাদারের নাম-পরিচয় নিয়ে চলে তুমুল আালোচনা। এরপর পুলিশের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দুুয়েকজন উঠতি সন্ত্রাসী গ্রেফতারের তথ্য জানানো হয়।
সপ্তাহ পার না হতেই সন্ত্রাসীরা পুলিশের নাকের ডগায় দাপিয়ে বেড়ায়। গেল অন্তত এক বছর এই চিত্র স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছেন নগরবাসী। গত ৬ মাসেই দিন-দুপুরে অন্তত এক ডজন হামলা-গুলির ঘটনা ঘটেছে। হামলায় সরাসরি জড়িত বেশিরভাগ সন্ত্রাসী অধরা। সর্বশেষ ১৩ জুলাই দিন-দুপুরে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ। তাৎক্ষণিক জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তিন দিন পর গত বুধবার বিকালে পুলিশ জানায়, জড়িত ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তারা ওই হামলায় জড়িত কি না পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি।
নগরীতে সশস্ত্র তৎপরতায় বারবার নাম উঠে আসছে বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদের নাম। এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরতে ইন্টারপোলের নোটিস জারি আছে। জমি দখল, চাঁদাবাজি থেকে টার্গেট কিলিংয়ে সাজ্জাদ বাহিনীর নাম আসছে। বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছোট সাজ্জাদ জেলে। সেই বাহিনীর দেখভালের দায়িত্বে এখন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন।
এই গ্রুপেই আছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান। গ্রুপের চাঁদা দাবির কৌশল একই ধরনের। প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি নম্বর থেকে টার্গেট ব্যক্তিকে কলা করা হয়। নির্ধারিত চাঁদার পরিমাণ এবং চাঁদা দেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর সময় পার হলেই হামলা চালানো হয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা বাসাবাড়িতে।
১১ জুলাই ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের মালিকের কাছে ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। মাসে ১০ লাখ করে চাঁদা দিতে হুমকি দেওয়া হয়। বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে এই হুমকি দেওয়া হয়। হুমকির ঠিক ২ দিনের মাথায় ১৩ জুলাই ডিডিএন অফিসে সশস্ত্র হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা।
ইমন-রায়হান দুজনই বহু হত্যা মামলার আসামি। এর মধ্যে ইমন সাতটি খুনের মামলার আসামি। খুনের মামলা ছাড়াও ইমন-রায়হানের নামে চাঁদাবাজির অসংখ্য মামলা আছে। দুই সন্ত্রাসীর কেউ এখনও ধরা পড়েনি।
সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা গোটা নগরীতে। তবে নগরীর চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় এই বাহিনী বেশি তৎপর।
নগরীতে সংঘটিত বিভিন্ন খুনের ঘটনায় ইমন-রায়হানের জড়িত থাকার তথ্য আছে পুলিশের কাছে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুনে সরাসরি জড়িত ছিল ইমন।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায় ইমনের নাম আছে। ডিজিটাল ডট নেট অফিসে হামলার পর বেরিয়ে আসে আরও বিভিন্ন স্থানে হুমকির তথ্য। ১৩ জুলাই দুপুরে ডিডিএন অফিসে হামলা চালানো হয়। একই দিন সন্ধ্যায় একই এলাকার আরেক সেবা প্রতিষ্ঠানের মালিককে হুমকি দেয় ইমন। এই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘নেট প্লাস’।
প্রতিষ্ঠানের মালিক সাংবাদিকদের বলেন, ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে সরাসরি আমাকে ফোন দেওয়া হয়। ফোনে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে বলেন, ‘দেখছেন তো ডিডিএনকে কী অবস্থা করেছি। টাকা না দিলে আপনারও এমন পরিস্থিতি হবে’।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফোনে হুমকি হামলার ঘটনায় চাঁদা দাবির বিষয় আলোচনায় আসে। কিন্তু বছরজুড়েই এই বাহিনী নীরবে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা পুলিশকে জানালেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এই বাহিনী মাসে দুুই থেকে তিন কোটি টাকাা চাঁদা আদায় করার অভিযোগ আছে। ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী মুখ খুলছে না।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, এভাবে চললে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে। যখন তখন ফোন করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ফুটেজে যা দেখা গেল
১৩ জুলাই দুপুর ১২টার কিছু পর ৩০-৪০ জন সন্ত্রাসী হঠাৎ প্রবেশ করে ভাঙচুর শুরু করে ডিডিএন অফিসে। প্রায় সবার মুখে ছিল মাস্ক। বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ৩০। অনেকের মাথায় কালো ক্যাপ ছিল। প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙচুর শুরু হয়। অতর্কিত হামলার মুখে সন্ত্রস্ত কর্মীরা লাইন ধরে অফিস থেকে বের হতে থাকে। ভয়ে কর্মীদের কেউ কেউ হাত উঁচিয়ে বের হন। নারী কর্মীরা একজনের পেছনে আরেকজন সারিবদ্ধ হয়ে বের হতে থাকেন। সন্ত্রাসীরা অফিসের স্টিলের পাত ভেঙে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। একজনকে দেখা যায় হাতুড়ি দিয়ে ভাঙছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ। কালো ক্যাপ, মুখে সবুজ মাস্ক এক সন্ত্রাসীকে দেখা যায় খুঁজে খুঁজে হাতুড়ি দিয়ে ভাঙছে ল্যাপটপ। ওই দিন দুপুর ১২টা ২২ মিনিটের দিকে বেশি ভাঙচুর চালাতে দেখা যায়। দুপুর ২টা ২৬ মিনিটের দিকে দেখা যায় সন্ত্রাসীরা সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাচ্ছে।
অল্প সময়ে আলোচনায় ইমন
ডেভিড ইমনের পুরো নাম মোবারক হোসেন। বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চন নগরে। বাবার নাম মোহাম্মদ মুসা। দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম ইমনের। ফেসবুক পেজে আছে দুই লাখের বেশি ফলোয়ার। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাকে নিয়েই এখন বেশি আলোচনা। দুই দশক আগে চট্টগ্রামে আন্ডারওয়ার্ল্ডে আলোচনায় ছিল গিট্টু নাছির, গিয়াস হাজারিকা, মহিমসহ অনেকের নাম। ২০০৪ সালে র্যাবের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে ক্রস ফায়ারে নিহত হয়। অনেকে পালিয়ে যায় বিদেশে। তবে সময়ের পরিক্রমায় নতুন নতুন সন্ত্রাসীর নাম আলোচনায় এসেছে। গেল দুই বছর ধরে সক্রিয় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় ছিল ছোট সাজ্জাদের নাম। বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছোট সাজ্জাদ জেলে যাওয়ার পরই আসে রায়হানের নাম। বড় বড় অপারেশনে রায়হানের নামই আসে পুলিশের তদন্তে। রায়হানের সঙ্গে এখন নতুন করে আলোচনায় ইমন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর ইমন তৎপর হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ডিডিএন অফিসে হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমনকে নিয়ে ঝড় ওঠেছে। তার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।
ইমন-রায়হান চলতি বছরের শুরুতে বড় কয়েকটি হামলার ঘটনায় নেতৃত্বে ছিল বলে জানায় পুলিশ। গত ২ জানুয়ারি সকালে নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় কয়েক রাউন্ড গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এরপর ওই বাসার নিরাপত্তায় পুলিশের পাঁচ সদস্যকে নিয়োগ করা হয়। দুই মাসের মাথায় পুলিশ পাহারা থাকাবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আবার ওই বাসায় ফাঁকা গুলি করা হয়। হামলার আগে কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না পেয়ে বড় সাজ্জাদের বাহিনী ওই হামলা চালায়। এই হামলায় ইমন-রায়হানের সম্পৃক্ততা পায় পুলিশ।
সর্বশেষ ডিডিএন অফিসে হামলার ঘটনার জড়িত ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হামলার ঘটনার পর ডিডিএনের এক কর্মকর্তা ১৩ জুলাই রাতেই চকবাজার থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্ত চলছে। তবে মূল অভিযুক্ত ইমন ধরা পড়েনি। ইমনের অবস্থানও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, হামলায় জড়িত ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যতম অভিযুক্ত ডেভিড ইমনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সে যেখানে থাকুক ধরা হবে।
সাজানো নাটক বলল ইমন
ডিডিএন অফিসে হামলার এক দিন পর ১৪ জুলাই রাতে একটি অডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে ডেভিড ইমনকে বলতে শোনা যায়, হামলার ঘটনা ছিল সাজানো নাটক। আপনারা একটা জিনিস খেয়াল করেছেন হামলাকারীরা ভাঙচুর করেছে। কিন্তু কার গায়ে হাত দেয়নি।
ইমন আরও বলেন, আমি ও আমার লোকজন হামলার সঙ্গে জড়িত নয়। ডিডিএনের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। প্রাপ্য অর্থ ফেরত চাইতে তিনি কল দিয়েছিলেন ডিডিএন মালিককে। পাওনা পরিশোধ না করতে পরিকল্পিতভাবে হামলার ঘটনার দায় তার ওপর চাপানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন।
সময়ের আলো/এসএকে