খেলাপি কমাতে ‘ডামা’ আইন

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনাদায়ী বা মন্দ ঋণের লাগাম টানতে বড় ধরনের আইনি সংস্কারে হাত দিয়েছে সরকার।

2026-07-17T02:12:23+00:00
2026-07-17T02:12:23+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
খেলাপি কমাতে ‘ডামা’ আইন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ২:১২ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনাদায়ী বা মন্দ ঋণের লাগাম টানতে বড় ধরনের আইনি সংস্কারে হাত দিয়েছে সরকার। সংকটাপন্ন ঋণ আদায়ে পুরোপুরি নতুন এক কাঠামো গড়ে তুলতে ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের (ডামা)’ খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এ আইনের আওতায় বেসরকারি খাতের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণ কিনে নিতে পারবে। এরপর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তা আদায়, পুনর্গঠন কিংবা জামানত বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধার করবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর হিসাবখাতা থেকে অচল ঋণের বোঝা কমবে এবং নতুন করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ আইনের খসড়াটি প্রকাশ করে সর্বসাধারণ ও অংশীজনদের মতামত চেয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাংকিং খাতের সংকট উত্তরণে ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ মডেল বেশ সফল। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও অনাদায়ী ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ ও পেশাদার করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের গভীরতা বোঝা যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী বিগত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন করা, পুনঃতফসিলকৃত এবং আইনি স্থগিতাদেশে থাকা ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান।

ব্যাংকারদের মতে, আইনি জটিলতা, জামানত হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল আদায় প্রক্রিয়ার কারণে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। ফলে ব্যাংকের তারল্য ও মুনাফায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি বিশেষ সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠন করা হবে। এ ইউনিটই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া, তদারকি ও প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে।

লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে অচল ঋণ কিনে তা আদায়ের চেষ্টা করবে। তাদের সহায়তায় থাকবে লোন সার্ভিসার বা ঋণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, যারা ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে সমঝোতা, পুনঃতফসিল এবং সম্পদ মূল্যায়নে কাজ করবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি আদায়ের জন্য মূলত অর্থঋণ আদালতের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বেশ সময়সাপেক্ষ। নতুন আইন পাস হলে ব্যাংকগুলো সরাসরি এসব বিশেষায়িত কোম্পানির কাছে তাদের মন্দ ঋণ বিক্রি করে দিতে পারবে।

এ আইনের একটি অন্যতম দিক হলো, কেবল জামানত বিক্রি করেই ক্ষান্ত হওয়া নয়, বরং সংকটে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখারও চেষ্টা করা হবে। সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো চাইলে ঋণগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পুনর্গঠন করতে পারবে, নতুন অংশীদার বা বিনিয়োগকারী আনতে পারবে এবং প্রয়োজনে ব্যবসার অংশবিশেষ লিজ দিতে পারবে। তহবিল সংগ্রহের জন্য এসব কোম্পানি খেলাপি ঋণগুলো একত্রিত করে সিকিউরিটাইজেশন বা বন্ড ইস্যু করার সুযোগ পাবে। দেশি-বিদেশি উভয় উৎস থেকেই অর্থায়ন সংগ্রহ করা যাবে, তবে কোনোভাবেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না।

আইন অনুযায়ী এ খাতের কোম্পানিগুলোকে কোম্পানি আইন মেনে নিবন্ধিত হতে হবে এবং পর্যাপ্ত মূলধন থাকতে হবে। পর্ষদ ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যাংকিং, আইন বা সম্পদ পুনরুদ্ধারে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদে অন্তত ২০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক রাখা নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো সময় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি নিরীক্ষা করতে পারবে এবং নিয়ম অমান্য করলে লাইসেন্স বাতিলসহ জরিমানা করতে পারবে।

নতুন এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন ব্যাংক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, এই ব্যবস্থা সফল করতে হলে খেলাপি ঋণের বাজারভিত্তিক সঠিক দাম নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ঋণের জামানত হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি, যাতে একটি গতিশীল সেকেন্ডারি বাজার গড়ে ওঠে।

অন্যদিকে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অতীতেও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে দুর্বল আইনের কারণে সুফল মেলেনি। এবার যদি আইনি ত্রুটিগুলো দূর করা যায়, তবে এটি ব্যাংক খাতের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, খসড়াটির ওপর সংশ্লিষ্টদের মতামত বিশ্লেষণ করে আইনটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে। ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আইনটি বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাজার তৈরি হবে, যা ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট কাটানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও বড় ভূমিকা রাখবে।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   খেলাপি  আইন  অর্থনীতি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: