আরিফুল ইসলাম রিফাত, বয়স মাত্র ২৩ বছর। অনলাইন জুয়া খেলে পেয়ে গেছেন আলাদীনের চেরাগ। এই বয়সেই তিনি দুটি বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ গাড়ির মালিক। দৈনিক অর্ধলাখ টাকা খরচ করে থাকেন বিলাসবহুল হোটেলে। তার বৈধ কোনো ব্যবসা নেই। চাকরিও করেন না। পড়াশোনাও সামান্য। ধনী বাবার সন্তানও তিনি না। আরিফুল অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত। বিদেশি জুয়া চক্রের বাংলাদেশি পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করে তিনি পেয়েছেন আলাদীনের চেরাগ।
সম্প্রতি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) ইউনিট। গ্রেফতারদের মধ্যে অন্যতম এই মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত। গ্রেফতার অন্যরা হলেন- মো. আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির অধিক মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম। অন্যদিকে তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে অনলাইন জুয়ার চাঞ্চ্যলকর বেশ কিছু তথ্য।
গোয়েন্দা প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, আরিফসহ যে চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, এখানে প্রায় দৈনিক ৫ কোটি টাকার মতো লেনদেন করা হতো। আরিফ আগেও গ্রেফতার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে। আরিফ অবৈধ উপার্জনের টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করেন। কিছুদিন আগে পূর্বাচলে তার একটি বিএমডব্লিউ উল্টে যায়। এরপর তিনি আবার একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কেনেন।
পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে ভিন্ন কৌশলের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যেখান থেকে তাকে ধরেছি, সেখানেও তিনি তিনটা রুম বুকিং করেছিলেন। তিনি যে রুমে ছিলেন, সেই রুমের ভাড়াই প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা। তিনি সেখানে হয়তো চার-পাঁচ দিন থাকতেন। এরপর পুলিশ যখন তাকে লোকেট করবে, ঠিক তখন তিনি জায়গা পরিবর্তন করে অন্য কোনো হোটেলে বা কক্সবাজারে নামি-দামি হোটেলে রুম ভাড়া করতেন। দীর্ঘদিন তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই কৌশল অবলম্বন করেছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) বলেন, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোতে এমএফএস অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমে দৈনিক এক হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়।সংঘবদ্ধ চক্রটির বাংলাদেশ অংশের মূল হোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত। তার অধীনেই বাকিরা ওই কোম্পানির হয়ে কাজ করে।
আরিফের তথ্যমতে, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো দৈনিক মোট লেনদেনের ০.২- ১ শতাংশ টাকা তাদের প্রদান করে থাকত। প্রাপ্ত টাকার ৫০ শতাংশ টাকা সে তার ভেন্ডরদের প্রদান করে। এই টাকার ভাগের অংশ ভেন্ডর অর্থাৎ এমএফএস অ্যাকাউন্টের এজেন্ট, ডিএসও, সুপারভাইজার ক্ষেত্র বিশেষে হাউস ম্যানেজার, মালিক এবং এমএফএস কর্তৃপক্ষের লোকজনও পেয়ে থাকে বলে জানা যায়। এই টাকার বাইরে এই কাজে জড়িতদের জীবনযাত্রা সংক্রান্ত অন্যান্য সব খরচ (আবাসন, খাবার, যাতায়াত প্রভৃতি) কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে।
গ্রেফতার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস পরিচালনার কাজে অনেক পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে। বাংলাদেশকেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে যেসব পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে তার অধিকাংশই চায়নিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব পেমেন্ট কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় প্রচলিত লেনদেনের মাধ্যম প্রয়োজন হয়। যার দরুণ তারা অনলাইনে যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেমেন্ট কোম্পানি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে।
জুয়ার সাইট এবং অ্যাপস পরিচালনার জন্য সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিনশেষে হিসাব করে প্রাপ্ত লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এসব পারসোনাল অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম (বাইন্যান্স, বাইবিট, বিটগেট প্রভৃতি) ব্যবহার করে ক্রিপ্টো ডলার (ইউএসডিটি) ক্রয় করা হয়। পরবর্তী সময়ে পেমেন্ট কোম্পানির প্রেরিত ওয়ালেট অ্যাড্রেসে ওই ক্রিপ্টো ডলার প্রেরণ করা হয়।
ডিবি জানায়, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার সাইট ও অ্যাপগুলোর পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০টির মতো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করছে। এসব পেমেন্ট কোম্পানির দৈনিক লেনদেন কয়েক কোটি টাকার ওপরে। গ্রেফতার আসামিরা এসব পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করত এবং তাদের দৈনিক লেনদেন ছিল ৫ কোটি টাকার ওপরে। কোম্পানিটি চায়নিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
গ্রেফতার আসামি চায়নিজ নাগরিক নাথান ওরফে অ্যালিনের (ছদ্মনাম) এজেন্ট হয়ে বাংলাদেশে কাজ করে। ওই চায়নিজ নাগরিকরা একসময় বাংলাদেশে অবস্থান করত; বর্তমানে তারা চায়না থেকে কোম্পানিটি পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোয় এমএফএস অ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমে দৈনিক এক হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন সংঘটিত হয়ে থাকে। এসব লেনদেন থেকে প্রাপ্ত গ্রস প্রফিট পেমেন্ট কোম্পানিগুলো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডলারে কনভার্ট করে ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভালো পেমেন্ট কোম্পানিগুলোর প্রতিটি দৈনিক এক লাখ ইউএসডিটি ডলারের ওপরে পাচার করে থাকে। পেমেন্ট কোম্পানির প্রাপ্ত কাজ বাংলাদেশিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে করে। একটি অংশ এমএফএস অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করে, অন্য অংশ লভ্যাংশের বাংলাদেশি টাকা ক্রিপ্টো ডলারে কনভার্ট করে থাকে।
সময়ের আলো/আআ