ছিনতাইকারী বেশি উত্তরায়, আশ্রয় টঙ্গীর ২০ বস্তি

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে টঙ্গীর বস্তিগুলো। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উত্তরাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি)

2026-07-17T01:13:23+00:00
2026-07-17T01:14:10+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ছিনতাইকারী বেশি উত্তরায়, আশ্রয় টঙ্গীর ২০ বস্তি
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ১:১৩ এএম  আপডেট: ১৭.০৭.২০২৬ ১:১৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে টঙ্গীর বস্তিগুলো। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উত্তরাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) হিসাবেও ডিএমপির আট বিভাগের মধ্যে সর্বাধিকসংখ্যক ছিনতাইকারী অবস্থান করছে উত্তরা বিভাগে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও স্বীকার করছে, নিয়মিত অভিযানের পরও বস্তির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিগগিরই স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি), গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি), র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে করণীয় নির্ধারণে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

ডিএমপির আটটি বিভাগের মধ্যে উত্তরা বিভাগে অবস্থিত হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ঢাকা থেকে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথও এটি। এ ছাড়া এখানে রয়েছে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউস। রাজধানীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের বসবাস উত্তরায়। রাজধানী-লাগোয়া টঙ্গীও দেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।

কিন্তু টঙ্গীতে অবস্থিত বেশ কয়েকটি বস্তি টঙ্গী-গাজীপুর এবং উত্তরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। গত ১৫ জুন রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে র‌্যাব পরিচয়ে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এর ডিস্ট্রিবিউটরের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।

গত ৯ জুলাই সকালে ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের গাজীপুরার জিলানি মার্কেট এলাকায় কয়েকজন দুর্বৃত্ত একটি অটোরিকশার গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এক নারী যাত্রীকে কুপিয়ে তার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। গত ২৪ জুন গাজীপুরের টঙ্গীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে জনতার পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়।

টঙ্গীর বস্তি : জানা যায়, টঙ্গী এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে প্রায় ৬ লাখ শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস। উল্লেখযোগ্য বস্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে হাজী মাজার বস্তি (বর্তমানে ‘হাজী নগর আবাসিক এলাকা’ নামে পরিচিত), এরশাদ নগর বাস্তুহারা বস্তি, কেরানীরটেক বস্তি (আমতলি এলাকা), ব্যাংক মাঠ বস্তি (নতুন বাজার এলাকা), গোহাটা বস্তি (টঙ্গী বাজার এলাকা), রেলওয়ে বস্তি, মাছিমপুর এলাকার জিন্নাতের পেছনের বস্তি, নিশাতনগর এলাকার পেছনের বস্তি, তেঁতুলতলা বস্তি, সিপাহীপাড়া বস্তি, নামা বাজার বস্তি, কলাবাগান বস্তি, চুড়ি ফ্যাক্টরি বস্তি, বেক্সিমকোর পেছনের বস্তি, টঙ্গী মেডিকেলের পেছনের বস্তি এবং পরানমণ্ডলের টেক-কাঁঠালদিয়া বস্তি।

জানা যায়, বস্তিগুলো মূলত স্বল্প আয়ের মানুষের বাসস্থান হলেও বিভিন্ন সময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে এগুলো আলোচনায় আসে। বস্তিবাসীর একটি বড় অংশ ভাসমান। তাদের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অতীতে তাদের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগও ছিল।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা অপরাধীরা রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। তবে তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসেনি। চলতি বছর বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এসব অপরাধী নতুন করে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করছে।

এ প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম চৌধুরী বলেন, ছিনতাইকারীদের ‘আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতাদের’ বিষয়ে আমরা বেশ কিছু তথ্য পাচ্ছি। যারা পেছন থেকে সহযোগিতা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হবে। আমরা কিছু নাম পেয়েছি, তবে তদন্তের স্বার্থে তা গোপন রাখা হচ্ছে।

ডিএমপির তথ্য
জানা যায়, বর্তমানে ডিএমপির আটটি বিভাগে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩০০-এর বেশি। এর মধ্যে উত্তরা বিভাগে সক্রিয় ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় আড়াই শত, যা ডিএমপির আট বিভাগের মধ্যে সর্বাধিক। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, টঙ্গীর বিভিন্ন বস্তির বাসিন্দাদের একটি অংশ বিমানবন্দরে আসা যাত্রীদের টার্গেট করে ছিনতাই করছে।

রাজধানীর উত্তরা হাউস বিল্ডিং ও বিমানবন্দর সড়কে দিনদুপুরে কুপিয়ে ছিনতাই ও চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। দ্রুতই তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক। গত মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের ধরতে র‌্যাব নিয়মিত অভিযান চালালেও সেই শূন্যস্থান দ্রুত পূরণ হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নিয়মিত গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু চারপাশে এত বস্তি থাকার কারণে কোনো না কোনোভাবে আবার সেই শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যাচ্ছে।’

বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে- এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উত্তরা বিভাগের পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। প্রথম দিনে ৮২ জন এবং পরবর্তী সোমবার প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত সপ্তাহে টঙ্গী রেলস্টেশন ও মাজার বস্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা আরও অভিযান চালাব। ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন, কয়েক দিন আগে উত্তরার উপ-পুলিশ কমিশনারের (ডিসি) সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারিসহ বিভিন্ন শ্রেণির অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নেয়ামুল হালিম চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, টঙ্গী থেকে উত্তরা পর্যন্ত এলাকায় ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও তাদের জায়গা দ্রুত অন্যরা দখল করে নেয়। ফলে অপরাধের শূন্যতা তৈরি হয় না। একজন গ্রেফতার হলে আরেকজন দায়িত্ব নেয়, দ্বিতীয়জন গ্রেফতার হলে তৃতীয়জন- এভাবেই তাদের নেতৃত্ব চলতে থাকে। তবে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এছাড়া অপরাধ দমনে এসব ভাসমান মানুষকে কীভাবে পুনর্বাসন বা সরানো যায়, সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে শিগগিরই টঙ্গী ও উত্তরা এলাকার দুই সংসদ সদস্য (এমপি), গাজীপুর সিটি করপোরেশন, ডিএমপির উত্তরা বিভাগের ডিসি এবং গাজীপুরের জেলা প্রশাসককে নিয়ে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।

ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মির্জা তারেক আহমেদ বেগ সময়ের আলোকে বলেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি উত্তরার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে উত্তরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ফুট পেট্রোল ও মোটরসাইকেল পেট্রোলিংসহ সব ধরনের টহল জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু মাজার বস্তির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে র‌্যাব, জিসিসি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য বিদেশ থেকে ফিরলে সবাইকে নিয়ে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   ছিনতাইকারী  উত্তরা  টঙ্গী  বস্তি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: