জুলাই উচ্চারণের সঙ্গে যেন ভেসে ওঠে রক্তস্নাত এক বর্ষার বিভীষিকাময় স্মৃতি। যে মাসজুড়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। সেই ঘটনাবহুল অধ্যায়ের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সবচেয়ে আলোচিত এলাকাগুলোর একটি ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন যাত্রাবাড়ী থানা এলাকা। আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত সেখানে পুলিশের গুলিতে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এরপর অন্য অনেক এলাকার মতো যাত্রাবাড়ী থানার প্রতিও সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। সংশ্লিষ্টরা কমিউনিটি পুলিশিং ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি ও মামলাসহ দৈনন্দিন সেবামূলক কার্যক্রমে আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে থানাটি।
সরেজমিন দেখা যায়, থানার দ্বিতীয় তলায় অভিযোগ গ্রহণকেন্দ্রে সাধারণ মানুষের বেশ ভিড়। দুপুরের দিকে সেই ভিড় আরও বাড়ে। অথচ জুলাইয়ের ঘটনার পর চকচকে ভবনটি পরিণত হয়েছিল পোড়া ধ্বংসস্তূপে। দীর্ঘ সময় সেখানে বিরাজ করেছিল নিস্তব্ধতা। কার্যত বন্ধ হয়ে যায় থানার সব কার্যক্রম। সে সময় কয়েক মাস যাত্রাবাড়ী থানার কার্যক্রম পরিচালিত হয় পাশের ডেমরা থানার একটি তলা থেকে।
সংস্কার শেষে প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস পর আবারও নিজ ভবনে কার্যক্রম শুরু হয়। তবে তখনও মানুষের আস্থার সংকট ছিল স্পষ্ট। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ থানায় আসছেন, করছেন জিডি ও মামলা। একই সঙ্গে সেবাদানে ব্যস্ত সময় পার করছেন পুলিশ সদস্যরা।
গত রোববার থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে বসে থাকতে দেখা যায় পঞ্চাশোর্ধ্ব সেলিম হোসেনকে। যাত্রাবাড়ী ফলপট্টির এই ব্যবসায়ী স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করতে এসেছেন। তার মতো আরও অনেককে বিভিন্ন সেবা নিতে থানায় আসতে দেখা যায়।
তবে মানুষের উপস্থিতি বাড়লেও সবাই যে সন্তোষজনক সেবা পাচ্ছেন, তা নয়। মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় আসা ধোলাইপাড়ের বাসিন্দা ওহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘শনিবার রাতে আমার ফোন ছিনতাই হয়। পরে থানায় এসে ফোন উদ্ধারে সহযোগিতা চাই। জিডি করতে চাইলে আমাকে বাইরে কম্পিউটারের দোকান থেকে অভিযোগপত্র লিখিয়ে আনতে বলা হয়। থানা থেকেই যদি এটি লিখে দেওয়া হতো, তা হলে আমাদের জন্য সহজ হতো। আমরা তো এসব তেমন বুঝি না। এ ছাড়া ফোনটি কবে পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাইনি।’
এদিকে মামলা গ্রহণে বিলম্বের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ফারজানা নামে এক নারী। স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি থানায় আসেন। অভিযোগের পর তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেন। কিন্তু পরদিন মামলা করতে এলে তাকে সন্ধ্যার পর আসতে বলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তার মামলা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
থানার ডিউটি অফিসার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে থানায় আসছেন। আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন অন্তত ৫০ থেকে ৭০ জন মানুষ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসেন। মানুষের আস্থা আছে বলেই তারা থানায় আসছেন। আমরাও চেষ্টা করছি তাদের আরও ভালো সেবা দিতে।’
অন্যদিকে জুলাইয়ের ঘটনায় থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু সময়ের আলোকে বলেন, ‘জুলাইয়ের পর এখন থানার সব কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে। বিভিন্ন সমস্যায় মানুষ সারা দিন থানায় আসছেন। তবে রাতে অভিযোগকারীর চাপ বেশি থাকে।’ তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে আমরা কমিউনিটি পুলিশিংকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।’
থানায় হামলার ঘটনায় অগ্রগতি সম্পর্কে ওসি বলেন, ‘থানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শতাধিক মামলা হয়েছে। সেসব মামলার তদন্তসহ অন্যান্য আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
সময়ের আলো