মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংসের হুমকি ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাতীয়

ইরানের ওপর হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার ভোরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছে যায় রাজধানী তেহরানের কাছাকাছি এলাকায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র

2026-07-17T02:03:58+00:00
2026-07-17T02:03:58+00:00
 
  শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬,
২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংসের হুমকি ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ২:০৩ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের ওপর হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার ভোরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছে যায় রাজধানী তেহরানের কাছাকাছি এলাকায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ ভাঙতে আসা একটি বিদেশি তেল জাহাজেও আক্রমণ করেছে। জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে হাত দেয়, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে।

গত কয়েক দিন ধরে এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণে গত মাসের অস্থায়ী শান্তিচুক্তি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে এখন পর্যন্ত মার্কিন হামলায় দেশটিতে অন্তত ৩৫ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এখন এমন মোড়ে যেখানে যেকোনো মুহূর্তেই সীমিত সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপান্তরিত হতে পারে। বিবিসি, এপি ও আলজাজিরার প্রতিবেদন থেকে এসব বিষয় জানা গেছে।

এই সংঘাতের নতুন সবচেয়ে বড় মাত্রা হলো, এবার প্রথমবারের মতো মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র তেহরানের আশপাশের এলাকাগুলোতে পড়েছে। এর আগে হামলা সীমিত ছিল মূলত উপকূলীয় প্রদেশে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেমনান প্রদেশও। সেখানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা ও মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র অবস্থিত। এর পাশাপাশি হামেদান, হরমুজগান, খুজেস্তান, লুরেস্তান, মার্কাজি এবং সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হেনেছে মার্কিন বাহিনী।

এর আগে বুধবার মার্কিন বাহিনী সাধারণত রাতের বেলা হামলা চালানোর নিয়ম ভেঙে দিনের আলোতেও ব্যাপক আক্রমণ চালিয়েছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে তাদের আক্রমণের গতি দিনে দিনে বাড়ছে। সেই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হামলা ছিল গ্রেটার তুনব দ্বীপের ওপর। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির সংযোগস্থলে অবস্থিত এই ছোট পাথুরে দ্বীপটি ১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে দখল করে নেয় ইরান। বর্তমানে এটি ইরানের একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে, যার সাহায্যে তারা পুরো প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ওই হামলায় দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বুধবারের আরেকটি মারাত্মক হামলা ছিল সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশে ইরানের ৩৮৮তম যান্ত্রিক পদাতিক ব্রিগেডের ব্যারাকসের ওপর। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ওই আক্রমণে অন্তত ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যার ফলে সাধারণ সৈনিক ও পেশাদার সেনাসহ মোট ৭ জন নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

নৌ অবরোধ কার্যকর করার অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের দাবি, কুরাসাও পতাকাবাহী ‘বেলমা’ নামের তেল জাহাজটি ইরানের প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল এবং বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। পরিণতিস্বরূপ একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান জাহাজটির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এটিকে অকেজো করে দেয়।

এসব হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ইরান তার প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। তারা বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতে (তিনটি দেশেই মার্কিন সেনার বড় বড় ঘাঁটি রয়েছে) ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এখন পর্যন্ত ওই হামলায় কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে কুয়েতে বৃহস্পতিবার বিকালেও হামলা হয়েছে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র কর্নেল ইব্রাহিম জুলফাকারি এক ভিডিও বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি সম্বোধন করে সবচেয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প বারবার হুমকি দিচ্ছেন যে তারা আমাদের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেঙে ফেলবে।

তাদের যদি এটা করার সাহস হয় তবে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর ইস্পাতের আঘাতে এই পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিটি মার্কিন অবকাঠামো মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই, কোনোভাবেই আমরা এই জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ সহ্য করব না। এটা ইরানের অজেয় লাল রেখা।

এরই মাঝে ইরাকেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়দি যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা অবস্থায় তার দেশের উত্তরের কুর্দি অঞ্চলের ইরবিল শহরে রাতে ড্রোন হামলা হয়েছে। যদিও ড্রোনটি আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সফরে ইরান সমর্থিত সংগঠনগুলোকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরই এই হামলা ঘটায় সংকট বাড়ছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার বিকালে দক্ষিণ ইরাকের বসরা উপকূলে অবস্থিত একটি তেল জাহাজের ওপরও ড্রোন আক্রমণ হয়েছে।

এদিকে এ উত্তেজনার মাঝেও ট্রাম্প অদ্ভুত ধরনের দ্বৈত ভাষা ব্যবহার করছেন। পেনসিলভেনিয়ার আর্মি ওয়ার কলেজে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরান এখন আমাদের কাজগুলো পছন্দ করছে না, তারা নিশ্চয়ই একটি চুক্তি করতে চায়। এখন আমরা দেখব তারা সত্যিই চুক্তি করতে চায় নাকি আমাদের তাদের সম্পূর্ণরূপে খতম করতে হবে।

তবে বাস্তবে শান্তির পথ এখন অনেক বেশি বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রেবী স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার মধ্যস্থতা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তবু তিনি আশা প্রকাশ করেন, যখন দুই পক্ষই আরও বাড়তে বাড়তে শক্তি ব্যবহারের সীমায় পৌঁছে যাবে, তখনই শান্তির সূত্রটি আবার খুঁজে পাওয়া যাবে।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, ইরান ২০২৪ সাল থেকে আটকে রাখা একজন মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দিয়েছে। পরে মানবাধিকার আইনজীবী জারেড জেনসার জানান মুক্ত ব্যক্তিটি হলেন ডেনা কারারি, একজন মার্কিন-ইরানি দ্বৈত নাগরিক। যিনি একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান চালান এবং গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন।

অন্যদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব হিসেবে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৮৫ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। যদিও এটি সংঘাতের শীর্ষ সময়ে পৌঁছানো প্রায় ১২০ ডলারের তুলনায় কম, তবু নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে এই দাম বাড়া ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় মাথাব্যথা হিসেবে কাজ করছে।

সবমিলিয়ে পরিস্থিতি এখন চরমভাবে সংবেদনশীল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। যতদিন এই প্রণালি নিয়ে দুই শক্তির টানাটানি চলবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা থাকবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং তার প্রভাব পড়বে সরাসরি সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   মধ্যপ্রাচ্য  মার্কিন  ঘাঁটি  ধ্বংস  হুমকি  ইরান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: