বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সাগর। টানা ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় ইলিশের ভরা মৌসুমেও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে মাছ আহরণ। প্রাণ বাঁচাতে গত ৫ জুলাই থেকে গভীর সাগর ছেড়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও উপকূলের নিরাপদ ঘাটে আশ্রয় নিয়েছে শত শত মাছ ধরার ট্রলার।
এতে একদিকে যেমন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো জেলে, অন্যদিকে মৌসুমের শুরুতেই কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে গিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় জেলে, ট্রলার মালিক ও মৎস্য আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তাল সাগরের কারণে বর্তমানে গভীর সমুদ্রে কোনো মাছ ধরার ট্রলার নেই। উপকূলে ফেরার পথে ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রলারডুবির ঘটনাও ঘটেছে। ফিরে আসা ট্রলারগুলো সুন্দরবনের দুবলার চর, আলোরকোল, মেহেরআলী, ভেদাখালী এবং উপকূলের পাথরঘাটা, মহিপুর ও নিদ্রাসখিনাসহ বিভিন্ন নিরাপদ আশ্রয়ে নোঙর করে আছে।
শরণখোলার মৎস্য ব্যবসায়ী হবিবুর রহমান ও মো. কবির হাওলাদার জানান, ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা সাগরে গেলেও প্রথম কয়েকটি ট্রিপে আশানুরূপ ইলিশ মেলেনি। এর ওপর ইলিশের সংকট, জলদস্যুদের উৎপাত এবং বৈরী আবহাওয়া— এই তিন সংকটে জেলে ও মহাজনেরা এখন দিশেহারা।
তারা আরও জানান, একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে জ্বালানি, রসদ ও জেলেদের অগ্রিম দাদনসহ ট্রিপ প্রতি আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু গত কয়েক দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সেই বিপুল বিনিয়োগ এখন চরম ঝুঁকির মুখে। জেলেদের আয় বন্ধ থাকায় তাদের দৈনন্দিন খরচও বহন করতে হচ্ছে ট্রলার মালিকদের। ফলে লোকসানের পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে।
শরণখোলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, উত্তাল ঢেউয়ের কারণে জেলেরা জাল গুটিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। গত চার দিন ধরে শরণখোলার দুই শতাধিক ট্রলার সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও ঘাটে আশ্রয় নিয়ে আছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাগরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও জানান, উপজেলার দুই শতাধিক ট্রলারে গড়ে প্রায় তিন লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শুধু শরণখোলার ব্যবসায়ীদেরই প্রায় তিন কোটি টাকার পুঁজি আটকে গেছে। পরবর্তী ট্রিপের জন্য নতুন করে অর্থের জোগান কীভাবে হবে, তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন সবাই।
শরণখোলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, নিম্নচাপের কারণে সাগরের পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। দুর্ঘটনা এড়াতে জেলেরা নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রলার যেন সাগরে না যায়, সে বিষয়ে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সুন্দরবনের বিভিন্ন দুর্গম খালে অসংখ্য ট্রলার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগের সব ফাঁড়ি ও ক্যাম্পকে সতর্ক রাখা হয়েছে। যেকোনো জরুরি সহায়তায় বন বিভাগ প্রস্তুত রয়েছে।
সময়ের আলো/জোই