একসময় ‘দীঘির শহর’ নামে পরিচিত ছিল সিলেট। নগরের প্রায় প্রতিটি মহল্লায় ছিল দীঘি, পুকুর ও খাল। এসব জলাধার শুধু নগরের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং বৃষ্টির পানি ধারণ করে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল ও ভরাটের কারণে সেই ঐতিহ্যের অধিকাংশই এখন ইতিহাস।
সাগরদীঘির পাড়, লালদীঘির পাড়, রামেরদীঘির পাড়সহ অন্তত ২০ থেকে ২৫টি এলাকার নামে এখনও দীঘির স্মৃতি টিকে থাকলেও বাস্তবে সেসব দীঘির আর অস্তিত্ব নেই। এমন বাস্তবতায় ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকা বেশিরভাগ দীঘি এখন পরিত্যক্ত। এসব দীঘি চিহ্নিত করে সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)।
বুধবার অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় প্রথম ধাপে প্রকৌশল বিভাগকে নগরীর পরিত্যক্ত, দখল হওয়া ও হারিয়ে যাওয়া দীঘির তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকা প্রণয়নের পর আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীঘিগুলো সংরক্ষণ ও উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগরের ঐতিহ্যবাহী মাছুদীঘির অর্ধেক অংশ ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট অংশও ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। একইভাবে মজুমদারি এলাকার মজুমদার দীঘিও দখল ও ভরাটের হুমকিতে রয়েছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা-ই-রাফিন সরকার বলেন, সিলেটের ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষায় হারিয়ে যাওয়া এবং পরিত্যক্ত দীঘিগুলো চিহ্নিত করা হবে। এ তালিকায় সরকারি জলাধারের পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর, দীঘি স্থান পাবে। জনস্বার্থ বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব জলাধার সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন করা হবে। সিসিকের প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে তালিকা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তালিকা তৈরিকালে পুকুর বা দীঘির নাম, আশপাশের জনবসতির পরিসংখ্যান, বর্তমান অবস্থার আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র ধারণ করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লেফটেনেন্ট কর্নেল একলিম আবেদীন বলেন, দীঘি ও জলাশয় নগরের পরিবেশ, পানি ধারণক্ষমতা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। এসব জলাধার সংরক্ষণে সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর নাব্যতা হ্রাস, খাল-বিল ও দীঘি ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সিলেটে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তাদের মতে, হারিয়ে যাওয়া দীঘি পুনরুদ্ধার এবং বিদ্যমান জলাশয় সংরক্ষণ করা গেলে নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, সিটি করপোরেশনের এ উদ্যোগ শুধু হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে না, বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনেও দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সময়ের আলো/আরবিএন