সুরে আলো খোঁজেন কাজল মিত্র

বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

জন্ম থেকেই তার চোখে আলো নেই। পৃথিবীর রং, প্রিয়জনের মুখ কিংবা ভোরের প্রথম সূর্য— কোনোটিই দেখা হয়নি কখনো। তবু থেমে

2026-10-06T21:17:42+00:00
2026-10-06T21:17:42+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
২১ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
সুরে আলো খোঁজেন কাজল মিত্র
বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:১৭ পিএম 
রেওয়াজ করছেন কাজল মিত্র। ছবি : সময়ের আলো
জন্ম থেকেই তার চোখে আলো নেই। পৃথিবীর রং, প্রিয়জনের মুখ কিংবা ভোরের প্রথম সূর্য— কোনোটিই দেখা হয়নি কখনো। তবু থেমে থাকেনি জীবন। দৃষ্টিহীনতার অন্ধকার পেরিয়ে তিনি খুঁজে নিয়েছেন বেঁচে থাকার অবলম্বন। আর সেই অবলম্বনের নাম গান। পুরোনো একটি হারমোনিয়াম আর কণ্ঠ ভরা সুর নিয়েই কেটে গেছে জীবনের ৫৫ বছর। গান গেয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার। বলছিলাম চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম শাকপুরা গ্রামের কাজল মিত্রের কথা।

১৯৫৯ সালে জন্ম কাজল মিত্রের। পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই তিনি। জন্মের পরই পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, তাদের সন্তান চোখে দেখতে পান না। ছেলের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টার কমতি রাখেননি বাবা-মা। দেশের বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে ছুটেছেন। চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে দেশের বাইরেও। কিন্তু কোনো চেষ্টাতেই ফেরেনি চোখের আলো। তবে দৃষ্টিহীনতা তার জীবনের সব সম্ভাবনার পথ বন্ধ করতে পারেনি।

শৈশবে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগ হয়নি তার। বইয়ের অক্ষর চেনা কিংবা খাতায় নিজের নাম লেখার অভিজ্ঞতাও হয়নি। কিন্তু তার কণ্ঠে ছিল অন্যরকম এক শক্তি। সেই শক্তিই একসময় তাকে চিনিয়েছে মানুষের কাছে।

কাজল মিত্রের বয়স তখন ১১ কিংবা ১২ বছর। বাড়ির ঘাটের পাশে একটি আমগাছের নিচে বসে আপন মনে গান গাইছিলেন তিনি। সুরের মায়ায় তখনো অজানা ছিল তার ভবিষ্যৎ। ঠিক সেই সময় পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন সংগীতশিল্পী লক্ষ্মীপদ আচার্য। শিশুটির কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ান তিনি। কণ্ঠের মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে বুঝতে পারেন, এই ছেলের গানের বিশেষ প্রতিভা রয়েছে।


তিনি কাজলের বাবার সঙ্গে কথা বলেন এবং গানের তালিমের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর শুরু হয় সুরের পথে তার যাত্রা। একে একে আরও কয়েকজন গুরুর কাছে সংগীতের শিক্ষা নেন কাজল মিত্র। ধীরে ধীরে গান হয়ে ওঠে তার জীবনের সঙ্গী, পরিচয় ও জীবিকা।

এরপর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ পথচলায় হাতে হারমোনিয়াম নিয়ে ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্তে। গেয়েছেন বিভিন্ন ধরনের গান। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লালনগীতি, আধুনিক গান, দেশাত্মবোধক ও ভক্তিমূলক গানের পাশাপাশি তার কণ্ঠে শোনা যায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানও। গানের প্রতি ভালোবাসা থেকে লিখেছেন নিজের কিছু গান, দিয়েছেন সুরও।

গান গেয়ে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। পেয়েছেন করতালি ও প্রশংসা। এসবই তার জীবনের বড় প্রাপ্তি। কিন্তু এই প্রাপ্তির আড়ালেও রয়ে গেছে কিছু অপূর্ণতা।

দীর্ঘদিনের ইচ্ছে, একটি ভালো মানের হারমোনিয়াম কিনবেন। নিজের কণ্ঠে গাওয়া গান নিয়ে প্রকাশ করবেন একটি অ্যালবাম। নিজের সৃষ্টি ও কণ্ঠকে সংরক্ষণ করে রাখার স্বপ্ন দেখেছেন বহুবার। কিন্তু সীমিত আয়ের সংসারে সেই স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্যের কাছে বারবার থেমে যেতে হয়েছে তাকে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শরীরও এখন আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছে না। ডায়াবেটিস, কিডনির জটিলতা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে প্রতিদিন কাটে তার। বয়সের ভারে ক্লান্ত শরীর নিয়ে চলতে হয় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। তবু গানের টান কমেনি। সুযোগ পেলেই হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়েন। আঙুলের ছোঁয়ায় যন্ত্র থেকে ভেসে আসে সুর, আর সেই সুরেই যেন ফিরে পান জীবনের চেনা ছন্দ।


কাজল মিত্রের সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে একটি দোকানে চাকরি করেন। সীমিত আয়ের এই পরিবারে তার গানের উপার্জনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়স ও অসুস্থতা বাড়লেও জীবিকার তাগিদে গানকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হচ্ছে তাকে।

চোখে কখনো পৃথিবীর আলো দেখেননি কাজল মিত্র। দেখেননি রঙিন পৃথিবী কিংবা প্রিয়জনের মুখ। কিন্তু তার কণ্ঠে বেঁচে আছে অসংখ্য সুর, মানুষের জন্য গেয়ে চলেছেন একের পর এক গান। জীবনের নানা অপূর্ণতা আর শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সুরের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট।

যে গানের সুর একদিন আমগাছের নিচে থমকে দাঁড় করিয়েছিল এক সংগীতশিল্পীকে, সেই গানই আজও কাজল মিত্রের জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। চোখের আলো না থাকলেও সুরের আলোয় পথ চলছেন তিনি। তার স্বপ্নগুলো এখনো অপেক্ষায়— একটি ভালো হারমোনিয়াম, নিজের গানের একটি অ্যালবাম আর সংগীতের সঙ্গে বাকি পথটুকু কাটিয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   সুর  আলো  কাজল মিত্র  পৃথিবীর রং  প্রিয়জনের মুখ  ভোরের প্রথম সূর্য  জীবন  দৃষ্টিহীনতা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: