লোহা, তামা কিংবা রুপার মতো ধাতুগুলো সময়ের পরিক্রমায় বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বা তাতে মরিচা পড়ে। তবে স্বর্ণ বা সোনার ক্ষেত্রে এই ঘটনা একেবারেই ব্যতিক্রম। শত কিংবা হাজার বছরের প্রাচীন স্বর্ণালংকার বা মুদ্রা আজও আগের মতোই চকচকে পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোনার পরমাণুর বিশেষ গঠন ও অনন্য রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই এতে কখনো মরিচা ধরে না।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান এই ধাতুর রূপ কেন সময়ের সাথে মলিন হয় না, তা জানতে সম্প্রতি গভীরভাবে গবেষণা চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, শুধু রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তাই নয়, বরং সোনার পরমাণুগুলোর বিশেষ বিন্যাসও এটিকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। ফলে যুগের পর যুগ সোনা তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে পারে।
মরিচা ধরার মূল প্রক্রিয়া :
রসায়নের ভাষায় মরিচা ধরা মূলত এক ধরনের জারণ প্রক্রিয়া বা ‘অক্সিডেশন’। খোলা বাতাসে কোনো ধাতু যখন অক্সিজেন বা জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শে আসে, তখন তাদের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটে এবং ধাতুর উপরিভাগে নতুন যৌগ গঠিত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, লোহা বাতাসের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে আয়রন অক্সাইড অর্থাৎ মরিচা তৈরি করে। আর রুপা বাতাসের সালফারের সাথে বিক্রিয়া করে কালচে রূপ ধারণ করে। কিন্তু সোনা রাসায়নিকভাবে এতটাই নিষ্ক্রিয় যে এই সাধারণ পরিবেশে এতে বিক্রিয়া ঘটে না।
অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া না করার কারণ :
বিজ্ঞানীরা সোনাকে ‘নোবেল মেটাল’ বা অভিজাত ধাতু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে থাকেন। সোনার পরমাণুগুলোর ইলেকট্রন অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে, যার ফলে বাতাসের অক্সিজেন সহজে এর সাথে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। এ কারণেই হাজার বছর ধরে মাটির নিচে বা পানির তলদেশে থাকলেও বিশুদ্ধ সোনা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।
নতুন গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য :
টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখতে পান, সোনার একদম ওপরের স্তরের পরমাণুগুলো স্থির থাকে না। অক্সিজেনের উপস্থিতি টের পেলেই তারা নিজেদের এমনভাবে সাজিয়ে নেয়, যেন অক্সিজেনের সাথে তাদের বিক্রিয়া করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরমাণুগুলোর এই অদ্ভুত পুনর্বিন্যাস সোনার ওপর একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করে, যা জারণের গতি শত শত কোটি থেকে ট্রিলিয়ন গুণ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
সোনার গহনা কি সবসময় চকচকে থাকে?
তবে সব অলংকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি এক রকম নয়। খাঁটি বা ২৪ ক্যারেটের সোনায় কোনোদিন মরিচা ধরে না বা তা কালো হয় না। কিন্তু গহনা তৈরির সময় স্থায়িত্ব বাড়াতে ২২, ১৮ কিংবা ১৪ ক্যারেটের সোনায় তামা, রুপা বা অন্যান্য শংকর ধাতু মেশানো হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ওই মিশ্রিত ধাতুগুলোর ওপর প্রভাব পড়ে অলংকার কিছুটা মলিন বা কালচে হতে পারে। এ ছাড়া ধুলাবালি, প্রসাধনী, সাবান বা ঘামের আস্তরণ জমেও অলংকারের স্বাভাবিক দ্যুতি কিছুটা কমে যেতে পারে।
সোনার গহনা ভালো রাখার সহজ কিছু উপায় :
সোনার ক্ষয় না হলেও গহনার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা দীর্ঘস্থায়ী করতে কিছু যত্ন নেওয়া প্রয়োজন :
১. নরম কাপড়ে পেঁচিয়ে বা পৃথক জুয়েলারি বক্সে রাখা।
২. পারফিউম, মেকআপ বা রাসায়নিক ব্যবহার শেষ করে গহনা পরা।
৩. কুসুম গরম পানি ও মৃদু সাবান দিয়ে হালকাভাবে পরিষ্কার করা।
৪. শক্ত ব্রাশ বা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহার না করা।
৫. প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় পর অভিজ্ঞ জুয়েলার্স দিয়ে পালিশ করানো।
সোনার ক্ষয়হীন ও দ্যুতিময় থাকার রহস্য কেবল এর অর্থনৈতিক মূল্যে নয়, বরং লুকিয়ে আছে এর পরমাণুর সূক্ষ্ম ও প্রতিরক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যের মাঝে। প্রকৃতির এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্যই শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও সোনা তার সৌন্দর্য ও আকর্ষণে চির তরুণ রয়ে গেছে।
সময়ের আলো/জেডি