মা হওয়া একজন নারীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের অভিজ্ঞতা। নতুন অতিথির আগমনে পরিবারে যেমন খুশির জোয়ার বয়ে যায়, তেমনি একজন নতুন মায়ের জীবনেও আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। কিন্তু মাতৃত্বের আনন্দের আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে এক ধরনের মানসিক চাপ, যা সহজে চোখে পড়ে না। নতুন মায়েদের এই অদেখা মানসিক চাপ নিয়ে সচেতনতা এখনও যথেষ্ট নয়।
সন্তান জন্মের পর একজন নারীর শরীরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে তার মানসিক অবস্থার ওপরও। অনেক মা হঠাৎ করেই উদ্বিগ্ন, ক্লান্ত বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ঘুমের ঘাটতি, শিশুর সার্বক্ষণিক যত্ন, নিজের শারীরিক দুর্বলতা এবং নতুন দায়িত্বের চাপ মিলিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করা অস্বাভাবিক নয়।
গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. লোপা ত্রিপুরা বলেন, সন্তান জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে অনেক নারী ‘বেবি ব্লুজ’-এর শিকার হন। এ সময় তারা অকারণে কান্নাকাটি, মেজাজের ওঠানামা, উদ্বেগ বা হতাশা অনুভব করেন। সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে এই অবস্থা কেটে যায়। তবে লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে তা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের ইঙ্গিত হতে পারে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, ‘সন্তান জন্মের পর মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা তার শারীরিক সুস্থতার দিকে। অনেক সময় পরিবার বিষয়টিকে স্বাভাবিক ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যায়, ফলে সমস্যাটি জটিল হয়ে ওঠে।’
নতুন মায়েদের অন্যতম বড় মানসিক চাপ আসে নিজের প্রতি অতিরিক্ত প্রত্যাশা থেকে। সমাজে ‘পারফেক্ট মা’ হওয়ার যে অলিখিত চাপ রয়েছে, তা অনেক নারীর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। শিশুকে ঠিকমতো খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো বা তার সব চাহিদা পূরণ করতে না পারলে তারা নিজেকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য মায়েদের সাজানো-গোছানো জীবন দেখে অনেকের মনে হীনম্মন্যতাও তৈরি হয়।
ডা. মো. রাশেদুল হক আরও বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, সন্তান জন্মের পর সব দায়িত্ব একাই নিখুঁতভাবে পালন করতে হবে। এই মানসিক চাপ থেকেই উদ্বেগ ও হতাশা বাড়তে পারে। বাস্তবে একজন মায়েরও বিশ্রাম ও মানসিক সমর্থন প্রয়োজন।’
পরিবার ও সামাজিক সহায়তার অভাবও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। অনেক নারী সন্তান জন্মের পর নিজেকে একাকী অনুভব করেন। বিশেষ করে যারা কর্মজীবী, তাদের জন্য মাতৃত্ব ও পেশাগত দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরা যদি মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল না হন তা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
নতুন মায়ের আচরণে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। যেমন দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, কোনো কিছুতে আগ্রহ না পাওয়া, অতিরিক্ত উদ্বেগ, অস্বাভাবিক রাগ, ঘুমের সমস্যা, নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া কিংবা নিজের বা শিশুর ক্ষতির চিন্তা আসা। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এই মানসিক চাপ কমাতে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া, শিশুর যত্নে সহযোগিতা করা এবং তার অনুভূতিগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনা প্রয়োজন। নতুন মায়ের উচিত নিজের জন্যও কিছু সময় রাখা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজন হলে কাছের মানুষদের কাছে সাহায্য চাওয়া। মনে রাখতে হবে, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতার নয়, সচেতনতার পরিচয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসবের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি মায়ের মানসিক অবস্থারও মূল্যায়ন করা উচিত। পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা সহায়তা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মাতৃত্ব নিঃসন্দেহে আনন্দের, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানসিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একজন সুস্থ ও সুখী মা-ই একটি শিশুর সুস্থ বিকাশের ভিত্তি গড়ে দেন। তাই নতুন মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি পরিবার, সমাজ এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার আরও যত্নশীল হওয়া দরকার।
সময়ের আলো/আআ