সমুদ্রসৈকত মানেই আমরা বুঝি খোলা আকাশ, নীল জল, বালুকাবেলা ও পর্যটকদের কোলাহল। কিন্তু ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে এমন এক সৈকত, যেখানে সমুদ্রের তীরেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১০ ফুট উঁচু সাদা দেয়াল। দেয়ালের এক পাশে নারীদের জন্য নির্ধারিত এলাকা, অন্য পাশে পুরুষদের। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই লিঙ্গ-পৃথকীকরণের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে সৈকতটি। সৈকতটির নাম লা ল্যানতার্না। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘এল পেদোচিন’ নামেই বেশি পরিচিত।
উত্তর-পূর্ব ইতালির বন্দরনগরী ত্রিয়েস্তের প্রাণকেন্দ্রের কাছেই এর অবস্থান। প্রায় ১ দশমিক ২০ ইউরো প্রবেশমূল্য দিয়ে ভেতরের করিডর পেরোলেই সামনে পড়ে দুটি আলাদা জগৎ। নারীদের অংশে বয়সের ভিন্নতা স্পষ্ট। কেউ বই পড়ছেন, কেউ রোদ পোহাচ্ছেন, আবার কেউ সন্তানদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। শহরের কর্মজীবী নারীদেরও দেখা যায় দুপুরের বিরতিতে এখানে এসে একটু সাঁতার কেটে নিতে। অন্যদিকে পুরুষদের অংশে বয়স্করা তাস খেলে, আড্ডা দেয় কিংবা বন্দরকর্মীরা বিশ্রাম নেয়। স্বামী-স্ত্রী বা নারী-পুরুষ একসঙ্গে এলেও প্রবেশের পর তাদের আলাদা হয়ে যেতে হয়। তবে, সমুদ্রের পানিতে এই বিভাজন থাকে না। তীর থেকে সাঁতরে নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে খোলা পানিতে নারী-পুরুষ আবার একসঙ্গে হতে পারেন।

বাইরের পর্যটকদের কাছে এই ব্যবস্থা প্রথম দেখায় অদ্ভুত কিংবা পুরনো ধাঁচের মনে হতে পারে। একবার মিলান থেকে আসা এক পর্যটক দম্পতি সৈকতের নিয়ম দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করে টাকা ফেরতও চেয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে দেয়ালটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। বিশেষ করে নারীদের অনেকেই মনে করেন, পুরুষের দৃষ্টি বা সামাজিক বিচার-বিশ্লেষণের চাপ ছাড়াই এখানে স্বচ্ছন্দে সময় কাটানো যায়। শরীর নিয়ে সংকোচ, মেকআপ না করার চিন্তা কিংবা পোশাক নিয়ে অস্বস্তি- কোনোকিছু নিয়েই তাদের ভাবতে হয় না। চাইলে টপলেস হয়ে রোদ পোহানো কিংবা নিজের পছন্দের সাঁতারের পোশাক পরাও এখানে স্বাভাবিক। স্থানীয় লেখক নিকোল ব্রুসাফেরোও মনে করেন, এটি বৈষম্যের জায়গা নয়, বরং নারীদের জন্য নিজস্ব মুক্ত পরিসর।
এই সৈকতের ইতিহাস বেশ পুরনো। ধারণা করা হয়, ১৯০৩ সালের দিকে এর যাত্রা শুরু হয়। তখন ত্রিয়েস্তে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তৎকালীন অস্ট্রীয় আইনে জনসমক্ষে শালীনতা বজায় রাখার জন্য নারী ও পুরুষের গোসলের জায়গা আলাদা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখান থেকেই এই দেয়ালের সূত্রপাত। ‘পেদোচিন’ শব্দের অর্থ ‘উকুন’। প্রচলিত একটি লোককথা অনুযায়ী, একসময় অস্ট্রীয় সৈন্যরা এখানে এসে ঘোড়ার গায়ের পোকামাকড় পরিষ্কার করতেন বলেই এমন নামের প্রচলন ঘটে।
১৯৫৮ সালে নারীদের অংশে ভিড় বেড়ে যাওয়ায় সৈকতের সেই অংশ সম্প্রসারণ করে দেয়ালটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় ত্রিয়েস্তেতে নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক স্বাধীনতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। ফলে, সময়ের সঙ্গে এই সৈকত কেবল আলাদা করে স্নানের জায়গা হিসেবে নয়, নারীদের নিজস্ব অধিকার ও স্বাধীনতার একটি প্রতীক হিসেবেও পরিচিতি পেতে থাকে।
বর্তমানে ইতালির অধিকাংশ সমুদ্রসৈকত যেখানে পর্যটকদের ভিড়, উচ্চ শব্দ ও ব্যস্ততায় মুখর, সেখানে এল পেদোচিনে অন্যরকম শান্ত পরিবেশ বিরাজ করে। কেউ সস্তা বারে বসে কফি পান করেন, কেউ প্রতিবেশীর সঙ্গে গল্প করেন, আবার কেউ নিরিবিলিতে সমুদ্র উপভোগ করেন।
মাঝেমধ্যে এই পুরনো ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কথা উঠলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও পৌর প্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ এর বিরোধিতা করেন। তাদের কাছে দেয়ালটি ত্রিয়েস্তের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।
সূত্র : সিএনএন, দ্য আই নিউজপেপার
সময়ের আলো/মহু