বাঁশ বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বাঁশঝাড়, ঘরের বেড়া, মাচা কিংবা নানা হস্তশিল্প। কিন্তু এশিয়ার বেশ কিছু দেশে বাঁশ শুধু নির্মাণসামগ্রী নয়, রান্নাঘরেরও পরিচিত উপকরণ। বিশেষ করে কচি বাঁশের কুঁড়ি বা ‘ব্যাম্বু শুট’ চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার কিছু জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতির অংশ।
খাবার হিসেবে বাঁশের পুরো গাছ ব্যবহার করা হয় না। মাটি থেকে বের হওয়া কচি কুঁড়ি শক্ত হওয়ার আগেই সংগ্রহ করা হয়। খোসা ছাড়িয়ে এগুলো সাধারণত সেদ্ধ, ভাজি, তরকারি, স্যুপ কিংবা মাছ-মাংসের সঙ্গে রান্না করা হয়। আবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য গাঁজনও করা হয়।
চীনা রান্নায় বাঁশের কুঁড়ির ব্যবহার বহু পুরোনো। তাজা ও শুকনো দুই ধরনের কুঁড়ি স্যুপ, নুডলস, স্টার-ফ্রাই ও মাংসের পদে ব্যবহৃত হয়। খাবারে এটি বিশেষ ধরনের মচমচে গঠন যোগ করে।
জাপানে কচি বাঁশের কুঁড়ি ‘টাকেনোকো’ নামে পরিচিত। বসন্তে নতুন কুঁড়ি সংগ্রহ করে ভাত, স্যুপ, স্ট্যু ও বিভিন্ন সবজির পদে ব্যবহার করা হয়। মৌসুমি এই খাবারটি জাপানি ঐতিহ্যবাহী রান্নারও অংশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও ফিলিপাইনেও বাঁশের কুঁড়ির ব্যবহার রয়েছে। থাইল্যান্ডে কারি ও স্যুপে এটি বেশ পরিচিত। ইন্দোনেশিয়ায় ‘রিবাং’ নামে পরিচিত বাঁশের কুঁড়ি সবজি হিসেবে রান্না করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে গাঁজন করে সংরক্ষণ করা হয়।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বাঁশের কুঁড়ির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবারে এটি ব্যবহৃত হয়। কোথাও মাছ-মাংসের সঙ্গে, আবার কোথাও গাঁজন করা অবস্থায় বাঁশের কুঁড়ি রান্না করা হয়।
বাংলাদেশে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতিতে কচি বাঁশ ও গাঁজন করা বাঁশের ব্যবহার রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি সবজি, মাছ বা মাংসের সঙ্গে রান্না করা হয়।
বাঁশের কুঁড়িতে খাদ্যআঁশ, কিছু প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। তবে কাঁচা বাঁশের কুঁড়ি খাওয়া নিরাপদ নয়। কিছু প্রজাতিতে সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড থাকতে পারে, যা শরীরে ক্ষতিকর সায়ানাইড তৈরি করতে পারে। তাই খাবারের আগে সঠিকভাবে পরিষ্কার, সিদ্ধ ও প্রক্রিয়াজাত করা জরুরি।
একই উদ্ভিদ কোথাও ঘর তৈরির উপকরণ, কোথাও হস্তশিল্পের কাঁচামাল, আবার কোথাও জনপ্রিয় খাবার। বাঁশের কুঁড়ি খাওয়ার এই বৈচিত্র্য তাই শুধু বিচিত্র খাদ্যাভ্যাসের গল্প নয়, বরং বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতিরও পরিচয়।
সময়ের আলো/এমকে