অ্যালার্ম ঘড়ি আসার আগে মানুষ কীভাবে ঘুম থেকে উঠত?

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

ঘুম থেকে ওঠার সহজ উপায় হচ্ছে ফোনের অ্যালার্ম। আমরা অ্যালার্ম সেট করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অ্যালার্ম

2026-09-19T09:52:28+00:00
2026-09-19T10:15:45+00:00
 
  শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
অ্যালার্ম ঘড়ি আসার আগে মানুষ কীভাবে ঘুম থেকে উঠত?
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫২ এএম  আপডেট: ১৯.০৯.২০২৬ ১০:১৫ এএম
অ্যালার্ম ঘড়ি। ছবি : সংগৃহীত
ঘুম থেকে ওঠার সহজ উপায় হচ্ছে ফোনের অ্যালার্ম। আমরা অ্যালার্ম সেট করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে পারি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অ্যালার্ম ঘড়ি আবিষ্কারের আগে মানুষ সময়মতো ঘুম থেকে জাগত কীভাবে?

তখনকার দিনে ঘুম ভাঙানোর জন্য একেবারেই আলাদা আলাদা পথ বেছে নিতো মানুষ। কেউ কেউ তো এই কাজের জন্য আলাদা মানুষই ভাড়া করত। এছাড়াও বিশেষভাবে তৈরি মোমবাতি ব্যবহার করা হতো, যেটা গলতে গলতে প্রতি ঘণ্টায় একটা পেরেক ধাতব ট্রেতে ফেলে শব্দ তৈরি করত। ছিল মোরগ পোষার প্রচলনও।

তবে, সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপারটা ঘটেছিল ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের সময়। তখন গড়ে উঠেছিল ‘নকার আপার্স’ নামের একটি পেশা, যাদের কাজই ছিল মানুষকে ঘুম থেকে তুলে দেওয়া। সহজভাবে বললে, এরা এমন মানুষ যারা অন্যদের ধাক্কা দিয়ে বা ডেকে ঘুম থেকে তুলত। আজকাল আমরা অ্যালার্ম বন্ধ করে আরও কিছুক্ষণ বিছানায় গড়িয়ে নিতে পারি। কিন্তু এই ‘নকার আপার্স’দের সময় সেই সুযোগ ছিল না। যতক্ষণ না মানুষ সত্যিই জেগে উঠছে, ততক্ষণ তারা দরজার সামনে থেকে যেত না।

মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন নকার আপার্সরা। ছবি : সংগৃহীত

মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন নকার আপার্সরা। ছবি : সংগৃহীত


উত্তর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অরুণিমা দত্তের বর্ণনা অনুযায়ী, এই মানুষগুলো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বা এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজা-জানালায় টোকা দিতেন। আবার কখনো জানালা দিয়ে ঘুমন্ত মানুষের দিকে মটরদানা ছুঁড়ে দিতেন। শিল্প বিপ্লবের সময় কারখানাগুলোর জন্য ব্যাপারটা আরও জরুরি হয়ে ওঠে। কাজ শুরুর সময় ছিল একদম বাঁধাধরা। মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি হলেই পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া থমকে যেত, যাতে মালিকপক্ষের বড় ক্ষতি হতো।

বিশেষ করে শীতের অন্ধকার ভোরে সময়মতো ঘুম ভাঙানো ছিল আসল চ্যালেঞ্জ। তখন প্রাথমিক পর্যায়ের অ্যালার্ম ঘড়ি বাজারে থাকলেও একজন সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে সেটা কেনা প্রায় অসম্ভব ছিল, কারণ দামটা অনেকটাই বেশি ছিল। শুরুতে কারখানাগুলো হুইসেল ও ঘণ্টা বাজিয়ে শ্রমিকদের জাগানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এই পদ্ধতি খুব একটা ভরসাযোগ্য ছিল না। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘নকার আপার্স’ পেশা।

অরুণিমা দত্ত আরও জানান, পৃথিবীর নানা প্রান্তে এমন ব্যবস্থার প্রচলন এখনো দেখা যায়। বিশেষভাবে মুসলিম সমাজে রমজান মাসে যখন সেহেরি করতে হয় ভোরের আগেই ও নামাজের জন্য উঠতে হয় খুব সকালে, তখন তাদের রাস্তায় দেখা যায়।


দিনের আলোই ছিল প্রথম ঘড়ি

অস্ট্রেলিয়ার সানশাইন কোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ফাতিমা ইয়াকুট বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হওয়ার অনেক আগে থেকেই মানুষ প্রকৃতির সংকেত ও দৈনন্দিন রুটিনের উপর ভরসা করেই সময়মতো জেগে উঠত।’

তার ভাষায়, দিনের আলোই ছিল সবচেয়ে বড় সংকেত। শিল্প বিপ্লবের আগে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত মেনেই মানুষের জীবন চলত, যা একধরনের প্রাকৃতিক ছন্দ তৈরি করত, একেই বলে সার্কেডিয়ান ছন্দ। মানুষসহ সব প্রাণীই এই জৈবিক ঘড়ি মেনে চলে, যা ঘুম আর জেগে উঠার সময় ঠিক করে দেয়। আরেকটা বড় নিয়ামক হলো সারাদিনের ধকল, যা রাতে ঘুমের চাহিদা বাড়িয়ে তোলে।

তবে, যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সাশা হ্যান্ডলির মত কিছুটা আলাদা। তিনি মনে করেন না যে, শিল্প-বিপ্লবের আগে মানুষ শুধু আলো-আঁধারের ছন্দ মেনেই চলত। তার যুক্তি, বিশেষ কিছু কাজের জন্য মানুষকে রাত অবধি বা ভোর হওয়া পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হতো। মানুষ তখন নিজের শরীরের ঘড়ি আর প্রযুক্তি, দুটো মিলিয়েই কাজ করত। যেমন, খামারের কাজ। শরৎকাল শেষ হলে ভোরের কাজ কমে আসত।  তখন ঘুমের সময় কিছুটা বাড়ত। আবার ধর্মীয় কারণেও মানুষকে তাড়াতাড়ি উঠতে হতো। নির্দিষ্ট সময়ে গির্জায় যাওয়া, নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করা বা খুব ভোরে প্রার্থনা সেড়ে নেওয়ার রেওয়াজ ছিল, যাতে ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছানো যায় বলে বিশ্বাস করা হতো। এমনকি কে আগে উঠে প্রার্থনা করল, তা নিয়ে একধরনের প্রতিযোগিতাও ছিল সেকালে।

দুই ভাগে ভাগ করা ঘুম

তখনকার ঘুমের ধরনই ছিল আজকের চেয়ে আলাদা। শিল্প বিপ্লবের আগে ‘বাইফেজিক’ বা দুই দফায় ভাগ করা ঘুমের একটা ধারণা প্রচলিত ছিল। যদিও এর সত্যতা নিয়ে কিছু গবেষকের সংশয় আছে। এই পদ্ধতিতে রাতের ঘুমের মাঝে কিছুক্ষণ জেগে থেকে আবার ঘুমানো বা রাতের ঘুমের পাশাপাশি দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার চল ছিল। গবেষণা বলছে, এখনো বিশ্বের নানা সমাজে দিনের মধ্যে কয়েক দফায় ঘুমানোর প্রবণতা দেখা যায়।


মোরগের ডাক

সাশা হ্যান্ডলির মতে, পশুপাখির ডাককেই মানুষের প্রথম অ্যালার্ম ঘড়ি বলা যেতে পারে। ভোরে মোরগের ডাক দিনের শুরুর ইঙ্গিত দিত। যদিও গবেষণায় জানা গেছে মোরগেরও নিজস্ব সার্কেডিয়ান ছন্দ আছে, আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ডাকতে শুরু করে, এমনটাও নয়।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ চ্যাম্পিয়ন বলেন, ‘ভোরের দিকে পাখিদের সম্মিলিত কলরবও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।’

গির্জার ঘণ্টা

সাশা হ্যান্ডলি আরও একটি সংকেতের কথা বলেন। সেটি হলো গির্জার ঘণ্টা। মধ্যযুগ ও শুরুর দিকের আধুনিক পশ্চিম-মধ্য ইউরোপে জনজীবন গড়ে উঠত গির্জাকে কেন্দ্র করে। প্রতি ঘণ্টায় বাজানো ঘণ্টার শব্দেই মানুষ নিজেদের দিনের কাজ সাজিয়ে নিতো।

ম্যাথিউ চ্যাম্পিয়ন জানান, গির্জায় যিনি ঘণ্টা বাজাতেন তার কাছে সময় মাপার জন্য বালিঘড়ি থাকত। অনেক বাড়িতেও নিজস্ব ঘণ্টা রাখা হতো, কখনো তা লাগানো থাকত ঘুমানোর ঘরের দরজায়।

হ্যান্ডলি বলেছেন, ‘বাড়ির কাজের মানুষদের নিজস্ব ঘণ্টা থাকত। তারাই আগে জেগে উঠে সময়মতো মালিক-মালকিনদের জাগিয়ে দিতেন।’

সেকালের অ্যালার্ম ঘড়ি

প্রাচীনতম অ্যালার্ম ঘড়ির একটা; যেখানে ধূপের উপর সুতার সঙ্গে ঝুলন্ত বলগুলো থাকত। সুতোগুলো পুড়ে বল নিচের ধাতব ট্রেতে পড়ে যেত, তখন ছোট ছোট ঝনঝন শব্দ হতো। ছবি : সংগৃহীত

প্রাচীনতম অ্যালার্ম ঘড়ির একটা; যেখানে ধূপের উপর সুতার সঙ্গে ঝুলন্ত বলগুলো থাকত। সুতোগুলো পুড়ে বল নিচের ধাতব ট্রেতে পড়ে যেত, তখন ছোট ছোট ঝনঝন শব্দ হতো। ছবি : সংগৃহীত


একেবারে গোড়ার দিকের ব্যক্তিগত অ্যালার্ম ব্যবস্থারও অনেক নজির আছে।

হ্যান্ডলি বলেন, ‘এই দুনিয়া কখনোই অ্যালার্ম ঘড়ি ছাড়া চলেনি; শুধু পদ্ধতিগুলো ভিন্ন ছিল। কাছের কাউকে জাগাতে আগে জল বা আগুনের শিখা ব্যবহার করা হতো। সমাজে যার অবস্থান যত উঁচু, তার পদ্ধতিও ছিল তত জটিল ও অলঙ্কৃত।’

প্রাচীন চীনে মোমবাতি ঘড়ির প্রচলন ছিল। যাতে সময় মাপার জন্য বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। হ্যান্ডলি জানান, এমন কৌশলে মোমবাতি বানানো হতো যে প্রতি ঘণ্টায় মোম গলে একটা পেরেক ধাতব ট্রেতে পড়ে শব্দ তৈরি করত। অনেকে খরচ বাঁচাতে নিজেরাই এমন মোমবাতি বানাতেন। সময় মাপতে ধূপও ব্যবহার হতো। আবার কখনো সুতোয় বাঁধা ধাতব বল নিচে রাখা ট্রেতে পড়ে ঘণ্টার শব্দ তৈরি করত। উনিশ শতকের এক মার্কিন জাতিতত্ত্ববিদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, চীনের মানুষ জেগে থাকার জন্য পায়ের আঙুলের ফাঁকে ধূপকাঠি গুঁজে রাখত।

পুরনো দিনের স্প্রিং চালিত ঘড়ি, যেখানে অ্যালার্ম বাজত এবং মোম জ্বলে উঠত। ছবি : সংগৃহীত

পুরনো দিনের স্প্রিং চালিত ঘড়ি, যেখানে অ্যালার্ম বাজত এবং মোম জ্বলে উঠত। ছবি : সংগৃহীত


প্রাচীন গ্রিসে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছে ক্লেপসিড্রা নামের জল-ঘড়ি। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে দার্শনিক প্লেটোকে কৃতিত্ব দেওয়া হয় এটাকে প্রথম অ্যালার্মে রূপ দেওয়ার জন্য। তিনি একটি পাত্রে হাওয়া আটকে তার ভেতর জল বইয়ে দিতেন। জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপও বাড়ত। শেষে কেটলির মতো জোরে হুইসেল বেজে উঠত।

ম্যাথিউ চ্যাম্পিয়নের মতে, গ্রামাঞ্চলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘণ্টা বাজানোর প্রাচীনতম নজিরগুলোর একটা ছিল এই জল-ঘড়ি। বড় জলাধার থেকে জল ছাড়লেই বেজে উঠত ঘণ্টা। দ্বাদশ শতকের এক নথিতে পাওয়া যায়, আগুন নেভাতেও এমন জলাধার কাজে লাগানো হতো।

ত্রয়োদশ শতকের শেষ ও চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আবির্ভূত হয়। চ্যাম্পিয়ন বলেন, ‘শুরুর দিকে ঘণ্টা বাজানোর আগে মাঝেসাঝে একটা সুর বাজানো হতো। পঞ্চদশ শতকের শেষে বাড়ির দেওয়াল ঘড়িতেও অ্যালার্ম যোগ হয়, যা একটা পিন দিয়ে সেট করা হতো। প্রথমে ঘণ্টার শব্দ হতো, তারপর একটা ছোট ঘণ্টি বারবার বেজে উঠত।’

নকার আপার্সদের রোমহর্ষক কীর্তি

সপ্তদশ শতকে ঘড়ি তৈরির প্রযুক্তিতে বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। হ্যান্ডলি জানান, তখন মানুষ ভ্রমণে যাওয়ার সময়ও নিজেদের অ্যালার্ম ঘড়ি সঙ্গে নিয়ে সময় মিলিয়ে নিতো। আমরা আজ যে অ্যালার্ম ঘড়ি চিনি, তার উদ্ভাবন হয়েছিল ১৭৮৭ সালে। প্রথম পেটেন্ট মেলার পর ১৮৭৬ সালে এর উৎপাদন বাড়ে। তবে, স্প্রিংচালিত সেই ঘড়ি তখনো ছিল দামি ও অনির্ভরযোগ্য।

শিল্প বিপ্লবের পর ঘুমের অভ্যাসেও অনেক বদল আসে। ঠিক তখনই যুক্তরাজ্যের লিডস, ম্যানচেস্টার, শেফিল্ড এবং পূর্ব লন্ডনের মতো ক্রমবর্ধমান শিল্প-শহরগুলোতে হাতে রড, লাঠি বা মটরশুঁটি ছোঁড়ার যন্ত্র নিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ‘নকার আপার্স’রা।


অরুণিমা দত্তের ভাষ্যমতে, এরা সারা রাত জেগে থাকতেন। ভোর তিনটে থেকেই মানুষ জাগানো শুরু করতেন। আর একদিক থেকে দেখলে এই পেশার মানুষেরা যেন সমাজেরও একরকম পাহারাদার ছিলেন। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে, তখন জেগে থাকার সুবাদে অনেক কিছুই তাদের নজরে পড়ত, যা অন্যদের চোখ এড়িয়ে যেত।

এর প্রমাণও ইতিহাসে আছে। ১৮৭৬ সালে ব্র্যাডফোর্ডে রাত দুটোর দিকে এক ‘নকার আপার’ লক্ষ করেন- একটা বাড়িতে আগুন লেগেছে। তখন গভীর ঘুমে থাকা পরিবারকে জাগিয়ে তিনি তাদের প্রাণ বাঁচান। ১৮৮৮ সালে আবার আরেকজন ‘নকার আপার’ খুঁজে পান কুখ্যাত ‘জ্যাক দ্য রিপার’ এর প্রথম শিকার মেরি নিকোলসের মৃতদেহ।

মজার একটা দিকও তুলে ধরেছেন অরুণিমা দত্ত। নিজের কাজে এতটাই নাছোড়বান্দা ছিলেন এই মানুষগুলো যে, প্রতিবেশীরা মাঝেমধ্যে তাদের নামে অভিযোগও করতেন, কখনো ডাকাডাকি নিয়ে হাতাহাতিও বেঁধে যেত।

সমসাময়িক পুলিশ রিপোর্ট ও সংবাদপত্র ঘেঁটে তিনি বলেন, ‘ম্যাগাজিন কার্টুনেও এই দৃশ্য উঠে এসেছে যে প্রতিবেশী উঠতে চাইতেন না, তার ঘুম ভাঙাতে গিয়ে অনেক সময় ঝগড়াও লেগে যেত।’

উনিশ শতকে ইউরোপের অন্য দেশেও এমন পেশা দেখা যায়। অরুণিমার ভাষায়, ইতালিতে ছিল ‘হুটার’, ফ্রান্সে ‘রেভেলিওর’। তবে, তাদের পদ্ধতি ব্রিটিশ নকার আপার্সদের চেয়ে অনেকটাই মার্জিত ছিল। তারা তীক্ষ্ণ শিস দিয়ে মানুষ জাগাতেন। ১৯২০ এর দশকের মধ্যে অবশ্য অ্যালার্ম ঘড়ি সস্তা ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় নকার আপার্সদের কাজ কমতে থাকে।

ফাতিমা ইয়াকুট বলেন, ‘উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে শিল্পায়ন ও কৃত্রিম আলোর প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত অ্যালার্ম ঘড়ির ব্যবহার বেড়ে যায়। তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন রুটিনও আরও গোছানো হয়ে ওঠে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই ধরে নেন সেকালের ঘুমের অভ্যাস আজকের চেয়ে বেশি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর ছিল, কিন্তু আসলে তা নয়। ভীড়ে ঠাসা এলাকা, হইচই বা কঠোর শারীরিক পরিশ্রম- এসব তখনকার মানুষের ঘুমে প্রভাব ফেলত।’

তবু, অ্যালার্ম ঘড়ি আসার আগের কিছু অভ্যাস আজও কাজে লাগানোর মতো। যেমন, সকালবেলা যতটা সম্ভব দিনের আলোয় থাকা। ইয়াকুটের মতে, গবেষণা বলছে সার্কেডিয়ান ছন্দ ঠিক রাখতে এবং সুস্থ ঘুমের জন্য সকালের আলো সবচেয়ে কার্যকর সংকেতগুলোর একটি। উল্টোদিকে, সন্ধ্যার পর কৃত্রিম আলোর সংস্পর্শ শরীরের নিজস্ব ঘড়িকে পিছিয়ে দিতে পারে এবং ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- নিয়ম মেনে ঘুমানো এবং জেগে উঠার অভ্যাস।

হ্যান্ডলি বলেছেন, ‘প্রাচীন গ্রিস থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত পুরনো চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থেও এই একই কথা বলা হয়েছে। আজকের গবেষণাও দেখাচ্ছে, অনিয়মিত ঘুমে স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি হতে পারে। এই তথ্য অনেকটাই মিলে যায় সেকালের ঘুমের নিয়মকানুনের সঙ্গে।’

হ্যান্ডলির কথায়, নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখাই আসলে অ্যালার্ম ছাড়া প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে জেগে ওঠার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সেকালের স্বাস্থ্যবিধি থেকেও আজ অনেক কিছু শেখার আছে, বলেন হ্যান্ডলি। যেমন, ঘুমানোর ঘরে কী কী থাকলে ঘুম শান্তিপূর্ণ ও নিয়মিত হয় আর কোন জিনিসগুলো সেই শান্তি নষ্ট করে, তা নিয়ে একটু ভাবা যেতে পারে। ঘুমানোর আগে কী খাচ্ছেন, সেটাও জরুরি। ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে চিনিযুক্ত বা শর্করাসমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো।

হ্যান্ডলির ভাষায়, ঘুম সংক্রান্ত এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো বহু শতাব্দী ধরে চলে এলেও আধুনিক জীবনে হয়ত আমরা সেগুলো ভুলে গেছি।

সূত্র : বিবিসি

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   অ্যালার্ম  ঘড়ি  ঘুম  আবিষ্কার  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: