চলমান মৎস্য প্রজনন মৌসুমে পূর্ব সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে চোরা শিকারিদের অনুপ্রবেশ রুখতে সুন্দরবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ‘ভাড়ানী’ খালের প্রবেশপথ কাঠের মজবুত বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে বন বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে বনে অবৈধ অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।
সম্প্রতি সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দাশের ভাড়ানী খালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নৌযান চলাচলের পথ শক্ত কাঠের খুঁটি ও লোহার পেরেক দিয়ে তৈরি মজবুত বেড়া দিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খালের তলদেশ থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচু করে খাড়া ও আড়াআড়িভাবে কাঠের খুঁটি পুঁতে এই কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এতে পানির স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা কিংবা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি হচ্ছে না, কেবল নৌকা নিয়ে বনে প্রবেশের পথটিই বন্ধ করা হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা খালের প্রধান সংযোগ পথ হিসেবে কাজ করে এই ভাড়ানী খালগুলো। এসব পথ ব্যবহার করেই অসাধু চক্র ও চোরা শিকারিরা বনের গভীরে ঢুকে অবৈধভাবে মাছ শিকারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাত। বর্তমানে প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়ায় নদীপথে তাদের অনুপ্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের আওতাধীন মোট ১০টি ভাড়ানী খালের মুখে এই কাঠের বেড়া দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জের লাউডোব ফাঁড়ির মরা ভদ্রার ভাড়ানী, ঘাগড়ামারী ফাঁড়ির জিয়ার ভাড়ানী ও খালেকের ভাড়ানী, ঢাংমারী স্টেশনের হুলার ভাড়ানী ও নওশেরখালী ভাড়ানী, করমজল স্টেশনের চারাখালী ও ৮ নম্বর খালের ভাড়ানী, নন্দবালা ফাঁড়ির সূর্যমুখী খাল এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা খাল, তেড়াবেকা খাল ও দাশের ভাড়ানী খাল উল্লেখযোগ্য।
শরণখোলা ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক মো. শরীফুল ইসলাম জানান, প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ এবং পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। কিন্তু এ সময় কিছু অসাধু চক্র গোপনে বনাঞ্চলে ঢুকে বিষাক্ত রাসায়নিক, জাল এবং স্থানীয় ‘চড়গড়া’ পদ্ধতি ব্যবহার করে ডিমওয়ালা মা-মাছ ও পোনা মাছ নিধন করত। এসব অপরাধীদের প্রধান যাতায়াতের পথ ছিল ভাড়ানী খালগুলো। তাই খালগুলোর প্রবেশপথ কাঠের বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় জেলারাও। তাদের মতে, প্রজনন মৌসুমে এসব খালে বড় বড় মা-মাছ ডিম ছাড়ে। অতীতে চোরা শিকারিরা সহজেই প্রবেশ করে মাছ নিধন করত। এখন পথ বন্ধ থাকায় মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে বনে মাছের উৎপাদন বাড়বে, যা জেলেদের জীবিকাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, খালের মুখ বন্ধ করার পর থেকে অভয়ারণ্যে অপরাধের মাত্রা দৃশ্যমানভাবে কমেছে। মাছের বংশবৃদ্ধির পাশাপাশি সুন্দরবনের সামগ্রিক জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
সময়ের আলো/জোই