প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, সরকারের ক্ষমতার একমাত্র উৎস দেশের জনগণ।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালেটিকস (দায়রা) আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স-২০২৬’-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। গত ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সংঘটিত রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নৃশংসতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছিল বিএনপি। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু এবং ভুয়া মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দলটি। তার ভাষ্য, এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হওয়াই এর অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, বিগত শাসনামলে শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। ক্ষমতার আকার বা শক্তি যাই হোক না কেন, তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা সব পক্ষকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
গুমের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিরাও গুমের শিকার হয়েছেন। আল্লাহর রহমতে কিছু মানুষ ফিরে এলেও অনেকেই আর ফিরে আসেননি।
তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। ৭০০-এর বেশি গুম হওয়া ব্যক্তি এখনও ফিরে আসেননি। যেসব শিশু তাদের বাবাকে কিংবা যেসব স্ত্রী তাদের স্বামীকে হারিয়েছেন, সেই অপূরণীয় বেদনা বর্তমান সরকার গভীরভাবে অনুধাবন করে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বজন হারানোর বেদনা বহন করছেন উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, তার বাবা দেশের রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। তার মা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর মারা গেছেন। তার ভাইও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কষ্ট প্রধানমন্ত্রী আত্মিকভাবে অনুভব করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রচারের অধিকারও একসময় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আদালত ও আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে তার বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়। তিনি শুধু শারীরিক নির্যাতনের শিকারই হননি, দীর্ঘদিন দেশে ফিরতে পারেননি। তার বাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল এবং চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তার স্ত্রীর চাকরিও বাতিল করা হয়েছিল। ফলে এই পরিবার ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে।
বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং নেতাকর্মীদের অনেকের বিরুদ্ধেই শত শত ভুয়া মামলা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, অতীতে একজন নারী ভোটার শুধুমাত্র বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কারণে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। এটাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস। তৃণমূল থেকে শুরু করে গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল।
মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ। এটি গত দেড় দশকের শাসনব্যবস্থার তুলনায় বড় পরিবর্তন। অতীতে ক্ষমতার উৎস ছিল না জনগণ; বরং পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একাংশকে ব্যবহার করে স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় টিকে ছিল।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার একটি ‘রিসেট বোতাম’ চেপে নতুন এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে আনাই সরকারের লক্ষ্য। সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের কার্যক্রমেই সেই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা যায়, সরকারের জানা মতে গত পাঁচ মাসে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা গুমের একটি ঘটনাও ঘটেনি। এই ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার রাজনীতিতে প্রতিশোধের সংস্কৃতির পরিবর্তে ন্যায্য বিচারের নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একদিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভিন্নমত ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করা হবে, অন্যদিকে বিগত শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধী ও নির্দেশদাতাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো কোনো অপরাধী যেন পার না পায়, আবার কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।
মাহ্দী আমিন বলেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে পুনর্মিলন ও সমঝোতার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটিকেই সরকার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সরকারবিহীন পরিস্থিতিতে বৃহত্তম দল হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে থেকে জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করেছিল।
তিনি বলেন, আগামী দিনগুলোতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নারী ও যুবসমাজকে ক্ষমতায়ন এবং সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করাই সরকারের উন্নয়ন এজেন্ডার অংশ।
বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম পাঁচ মাসের সফলতা পুরো মেয়াদেই ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী। প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনতে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ করছে এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, একতাবদ্ধ সমাজ গঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই সরকারের অঙ্গীকার। জনগণের ঐক্য ও সমর্থন থাকলে এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রথম পাঁচ মাসে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা আগামী পাঁচ বছরও অব্যাহত থাকবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপুল প্রাণহানি, রক্তপাত ও দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের গণতান্ত্রিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ে নির্বাচিত সরকারের আমলেই প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উপযুক্ত সময় এসেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃত অর্থে একটি সরকার হতে হবে ‘জনগণের, জনগণের জন্য এবং জনগণের দ্বারা’। প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় নেতৃত্বে সেই স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সময়ের দাও/আরবিএন