যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরানের সরকার ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি-এর মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্প্রচার না করায় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটির বিরুদ্ধে ‘সেন্সরশিপের’ অভিযোগ তুলেছে সরকার। তবে আইআরআইবি দাবি করেছে, দেশের নেতৃত্বে বিভক্তির ভুল বার্তা এড়াতেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত শুক্রবার ইরানের সরকারি তথ্য পরিষদ এক বিবৃতিতে জানায়, চলতি সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের দেওয়া ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সম্প্রচার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জনসাধারণের কাছে তথ্য গোপন করেছে।
অন্যদিকে শনিবার আইআরআইবি পাল্টা বিবৃতিতে সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, দেশের নেতৃত্বের মধ্যে দ্বৈত অবস্থান রয়েছে— এমন ভুল ধারণা সৃষ্টি হতে পারে, তাই সম্প্রচারে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
সম্প্রচার থেকে বাদ পড়া বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, গত বছরের ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধিতা করলেও ব্যক্তিগতভাবে আলোচনার অনুমতি দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা নেতার কাছে গিয়ে দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরেছিলাম। তিনি আমাদের আলোচনায় যেতে নির্দেশ দেন। তার নির্দেশেই আমরা আলোচনা শুরু করি।’
সরকারের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের আলোচনাবিষয়ক সাক্ষাৎকারের অংশও সম্প্রচার করা হয়নি। একইভাবে বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন জানিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তার একটি অংশও প্রচার থেকে বাদ দেওয়া হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও আইআরআইবির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে ফক্স নিউজ, সিএনএনসহ বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমে ইরানের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরলেও সেসব সাক্ষাৎকারের মাত্র এক-দুটি সাবটাইটেল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে।
আরাগচি আরও বলেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত (বর্তমানে স্থগিত) সমঝোতা স্মারকটি নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল— কট্টরপন্থীদের এমন দাবি সঠিক নয়। তার ভাষায়, সে সময়ের পরিস্থিতিতে এটিই ছিল সর্বোত্তম সম্ভাব্য সমঝোতা।
সরকার অভিযোগ করেছে, আইআরআইবির ভেতরে থাকা একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী— ইঙ্গিতপূর্ণভাবে কট্টরপন্থী ‘পায়দারি ফ্রন্ট’— এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তাদের আচরণ জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
জবাবে আইআরআইবি বলেছে, বিতর্কিত বক্তব্য সম্প্রচার করলে দেশের নেতৃত্বে বিভক্তির ধারণা আরও জোরালো হতো।
উভয়পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির ‘জাতীয় ঐক্য’ বজায় রাখার নির্দেশনার পরিপন্থী আচরণের অভিযোগ তুলেছে।
সংসদের সদস্য ও আইআরআইবির কার্যক্রম তদারকি কমিটির মুখপাত্র মোহাম্মদ মিরজাই বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে বিভিন্ন মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করতে সতর্ক করা হয়েছে।
সংরক্ষণশীল সাংবাদিক মোহাম্মদ মোহাজেরি মন্তব্য করেছেন, আইআরআইবি এখন সবচেয়ে ব্যয়বহুল হলেও সবচেয়ে কম কার্যকর। সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ-সাদেক জাভাদি-হেসার বলেন, ‘দেশে যেন একটি সরকার কাজ করছে, আর আইআরআইবি আরেকটি সরকার হিসেবে তার বিরোধিতা করছে।’
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এন্তেখাব জানিয়েছে, আলোচনাবিষয়ক সম্প্রচার নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান আইআরআইবি প্রধান পেইমান জেবেলিকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বাজেট কমানোর হুমকির খবর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এই বিরোধের মধ্যেই শুক্রবার ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান সফর করেন। তারা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্যতম প্রধান বিরোধের বিষয়।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ ‘খুব ভালোভাবে’ এগোচ্ছে এবং শিগগিরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন সফর করবেন। তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও দ্রুত কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন না।
অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদর বলেছেন, ‘শত্রুর পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ এবং যুদ্ধে নিহত বেসামরিক মানুষের রক্তের প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত থাকবে।
সময়ের আলো/কেএই্চ