স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ দাবানলের কবলে পড়েছে ফ্রান্স ও স্পেন। তীব্র গরম ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুরু হওয়া এ দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। যার ফলে এ দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সংবাদমাধ্যম সিএনএন শনিবার জানিয়েছে, বনাঞ্চল গ্রাস করার পর আগুন এখন এগিয়ে আসছে শহরের দিকে। ফ্রান্স সরকার বোর্দো এবং আটলান্টিকের উপকূলীয় অঞ্চলের বিশাল অংশ থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বলেছে।
অপরদিকে স্পেনের মাদ্রিদের ঠিক পূর্ব দিকের একাধিক শহরের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সান্তেজ এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। সেখানকার আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সের বোর্দো শহর ও স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের আশপাশে ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে দুই দেশ মিলিয়ে অন্তত ২ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত শুক্রবার দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহায়তা চেয়েছেন। স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, আগুন দ্রুত বোর্দো শহরে ছড়িয়ে পড়ছে।
বোর্দোর দক্ষিণে আটলান্টিক উপকূলের অভিজাত ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপ থেকে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরও প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। উপদ্বীপে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কেউ নৌকায় করে, আবার কেউ ব্যক্তিগত গাড়িতে এলাকা ছেড়ে গেছেন। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আবাস হিসেবে পরিচিত ক্যাপ ফেরেতে ইতিমধ্যে ৫০টির বেশি বাড়ি পুড়ে গেছে।
ফরাসি ও স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্স থেকে প্রায় ২ লাখ এবং মাদ্রিদ থেকে আরও ২৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন।
পরিস্থিতির কারণে স্পেন সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া ধোঁয়ার ঝুঁকির কারণে প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে ঘরের ভেতর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রবল বাতাস ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে শুষ্ক বনাঞ্চল মুহূর্তে পুড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্রান্স ও স্পেন উভয় দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা চেয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ বলেন, দেশটি এত বড় দাবানল আগে দেখেনি। বোর্দোকে রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে মাদ্রিদের দাবানল : এদিকে মাদ্রিদের জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান কার্লোস নোভিয়ো বলেন, রাজধানীর কাছের দাবানল এখন সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগুন এত ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে যে তা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ফায়ার সার্ভিস বাহিনীর নেই।’
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। তিনি বলেন, দাবানল মোকাবিলায় আরও এক হাজার সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। আগুনে এরই মধ্যে প্রায় ২২ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।
এ ছাড়া দাবানলের ধোঁয়া থেকে উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সুরক্ষায় গতকাল রাত থেকেই ফ্রান্সের জিরন্দ অঞ্চলে ১৫ লাখ মাস্ক পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেবাস্তিয়েন।
ক্যাপ ফেরের দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ৪০ কর্মী আহত হয়েছেন। এ সপ্তাহে ফ্রান্স ও ইতালিতে দাবানল নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিন কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
মাদ্রিদের পশ্চিমে জ্বলতে থাকা তিনটি বড় দাবানলের মধ্যে দুটি একীভূত হয়ে আরও বড় আকার ধারণ করেছে। এতে রাজধানী সংলগ্ন একটি শহরও হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মে মাস থেকে ইউরোপের কয়েকটি অঞ্চল অন্তত দুটি তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেখা দেওয়া দীর্ঘস্থায়ী খরা এ বছর দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন।
দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য স্কুল ও জিমনেসিয়ামে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অনেকেই জানেন না ফিরে গিয়ে তারা তাদের বাড়িঘর অক্ষত পাবেন কি না।
ক্যাপ ফেরের বাসিন্দা ৯০ বছর বয়সি মারিয়া লালানকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে একটি জিমনেসিয়ামে। তাড়াহুড়া করে বের হওয়ার সময় তিনি তার চশমা ও শ্রবণযন্ত্রও সঙ্গে নিতে পারেননি।
মারিয়া বলেন, ‘আমার হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও চোখে সমস্যা আছে। জানি না এই পরিস্থিতি কত দিন চলবে। আমার বাড়ির কী অবস্থা সেটাও জানি না। পুড়ে গেছে কি না সেটাও জানি না।’
জরুরি সহায়তা ইইউর : দাবানল নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফায়ার সার্ভিসের অতিরিক্ত কর্মী ও সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। ইইউর কাছে সহায়তা চাওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, স্পেনে চারটি ও ফ্রান্সে তিনটি অগ্নিনির্বাপণ বিমান পাঠানো হচ্ছে।
মাদ্রিদের আঞ্চলিক সরকারপ্রধান ইসাবেল দিয়াস আয়ুসো বলেন, রাজধানীর আশপাশে জ্বলতে থাকা দাবানলগুলো এ অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। তিনি আরও কয়েকটি এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মাদ্রিদের পশ্চিমে জ্বলতে থাকা দুটি দাবানল একীভূত হয়ে রাজধানী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের নাভাস দেল রে শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কর্মকর্তারা বলেন, এ আগুন পাশের কাস্তিয়া ই লেওন অঞ্চলের আরেকটি দাবানলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্ত্রী ও তিন কুকুর নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া হোসে কোবোস স্পেনের টেলিভিশন চ্যানেল আন্তেনা-৩-কে বলেন, ‘ধোঁয়া এত ঘন ছিল যে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল।’
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্পেনে একের পর এক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় দাবানলটি জ্বলছে গুয়াদালাহারা প্রদেশে, যা মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে। সেখানে ইতিমধ্যে প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে। ফ্রান্সে ক্যাপ ফেরে ও বিসকারোস এলাকার দাবানলে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়েছে। আর মাদ্রিদ অঞ্চলে আগুনে পুড়েছে আরও প্রায় ৬ হাজার হেক্টর।
এদিকে ইতালিতেও চলতি সপ্তাহে দাবানল ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বিশেষ করে সিসিলি দ্বীপে কয়েক ডজন দাবানল জ্বলছে। দাবানল নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের নিহত তিন কর্মীর একজন সিসিলিতে এবং অন্য দুজন ফ্রান্সের বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে প্রাণ হারান।
সময়ের আলো/এসএকে