ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার রাতেও দেশটির বিভিন্ন স্থানে হামলা অব্যাহত রাখে মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে বরাবরের মতোই পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটি জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা চালায়। এ ছাড়া ইরানে নতুন করে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যে চলমান লড়াইয়ের মধ্যেই এ প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির মাধ্যমে দেওয়া এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
অপরদিকে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে এ হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছে সৌদি আরব। হোদাইদাহ বন্দরনগরীতে হামলার জবাবে গোষ্ঠীটি এ পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে বাহরাইন ও কুয়েত কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
১৩তম রাতের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের খোররামাবাদ, জাস্ক, আহভাজ, বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপে হামলা চালায়। ইরানের স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আহভাজে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বন্দর আব্বাসে আরও দুজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে পার্শ্ববর্তী ইরাকের ইরবিলে একটি ড্রোন শনাক্ত হওয়ার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা হয়েছে। এ অবস্থায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ ধরনের আগ্রাসন অব্যাহত রাখে, তা হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য ‘ভারী মূল্য’ দিতে হবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সামরিক কমান্ড কেন্দ্র, ড্রোন মজুদকেন্দ্র, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বাহিনীটি জানিয়েছে, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হুমকি হ্রাস করা।
তেহরান থেকে আলজাজিরার তোহিদ আসাদি জানান, ইরানের কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি খুজেস্তান প্রদেশের রাজধানী আহভাজেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, খুজেস্তানের অপর প্রান্তের আন্দিমেশক ও ওমিদিয়া শহরেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন হামলায় দুজন আহত হয়েছেন।
যুক্তরাজ্যকে ইরানের হুমকি : ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, এই সংঘাতে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দেবে, তাদের পরিণতি ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে এ সতর্কবার্তা জানায় সংস্থাটি। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের এই হুমকি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেই দেওয়া হয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান সত্ত্বেও যুক্তরাজ্য সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হয়নি। তবে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে দেশটি।
অপরদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তবে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি প্রতিহত করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রিক নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরবে মোতায়েন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ভূপাতিত করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ইয়ানবুর তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। এর আগে চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের চালানো হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে হুথিরা। এ ঘটনার পর জিজান ও ইয়ানবু শহরে সতর্কতা জারি করা হয়।
শনিবার সকালে হুথি সমর্থিত আল মাসিরাহ টিভি জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে হুথিদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি কামারান দ্বীপেও হামলার খবর দিয়েছে। দ্বীপটিতে হামলায় এখন পর্যন্ত এক নারী আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হোদাইদাহ বন্দরেও বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বন্দরটিকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা অস্বীকার করেছে।
হোদাইদাহ বন্দর শহরটি হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইফলাইন। এ বন্দর দিয়ে হুথি নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনে অধিকাংশ বাণিজ্যিক পণ্য ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে থাকে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি এই উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য হুথিদের দায়ী করেছেন। তিনি লোহিত সাগরে জাহাজগুলোর ওপর গোষ্ঠীটির হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত ও বেপরোয়া’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এক বিবৃতিতে আল-মালিকি বলেছেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ‘সব প্রয়োজনীয় অভিযানিক পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা গ্রহণ’ অব্যাহত রাখবে। হুথিরা যদি তাদের ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ চালিয়ে যায়, তা হলে কঠোর হস্তে তা দমন করা হবে।
যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সম্পর্কে অবগত ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর তেহরান সফরকালে আল-জাইদি এ প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটির বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে ইরানি কর্মকর্তারা এটিকে বর্তমানে দেওয়া একমাত্র প্রস্তাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তারা জানিয়েছেন, তেহরান এটি প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ এ প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্যার কোনো সমাধান করা হয়নি। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, বিষয়টি ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
গত মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর আল-জাইদির এটিই ছিল ইরানে প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। তিনি একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রীপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সফর করেন এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ঘটনাবলি এবং নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, বৈঠকে আগে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি উভয় সরকার বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও আঞ্চলিক বিষয়ে বৃহত্তর সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, আল-জাইদি ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প যদি তেহরান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালান, তবে বৃহত্তর সংঘাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ইরানি কর্মকর্তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দুজন ইরানি কর্মকর্তার বরাতে পত্রিকাটি জানিয়েছে, এ ধরনের হামলা তেহরানকে আঞ্চলিকভাবে যুদ্ধ সম্প্রসারণে প্ররোচিত করবে। এর মধ্যে তেল আবিবকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীকে বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দিতে বলাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে