বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজ বাংলাদেশেও উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস। মূলত ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং এর টেকসই সুরক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছরের ২৬ জুলাই এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ইউনেস্কো ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত তাদের সাধারণ অধিবেশনে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে।
ইতিহাস ঘেঁটলে দেখা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তার বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে সুন্দরবনের সীমানা কুষ্টিয়া ও যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে উল্লেখ করেন। ১৭৭৬ সালেও বনের বাংলাদেশ অংশের ক্ষেত্রফল ছিল প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। তবে ২০১৬ সালের পরিমাপ অনুযায়ী, এই পরিধি অস্বাভাবিকভাবে কমে বর্তমানে মাত্র ৬ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারে এসে ঠেকেছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের একেবারে নিকটবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠা নানামুখী শিল্প-কারখানা, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বাণিজ্যিক রিসোর্টগুলো এই ঐতিহ্যবাহী বনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি সাধন করছে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত পর্যটন, প্লাস্টিকজনিত দূষণ, বনের নদীপথ দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল এবং প্রায়শই জাহাজডুবির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এমনকি নদীতে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, মাত্রাতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণ, গাছ কেটে ফেলা, আগুন দেওয়া ও বন্যপ্রাণী শিকারের মতো কর্মকাণ্ডের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের মাটি, পানি ও সমগ্র জীববৈচিত্র্যের ওপর।
সুন্দরবনকে রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে এর ৫২ শতাংশ অঞ্চলকে অভয়ারণ্য এবং চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী, ইসিএ চিহ্নিত এলাকাগুলোতে যেকোনো ধরনের শিল্প-কারখানা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু এত বিধিনিষেধ সত্ত্বেও বাস্তবে সেখানকার শিল্পায়ন কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছে না।
উদ্বেগ প্রকাশ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সরকারের ইসিএ ঘোষণার মুখে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গত এক দশকে বনের পাশেই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপিজি গ্যাস প্লান্ট ও অয়েল রিফাইনারিসহ অন্তত ৫০টি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এমনকি খোদ সরকারি খাদ্য বিভাগও বনের একেবারে কাছাকাছি বিশালাকার গুদামঘর নির্মাণ করেছে।
অধ্যাপক হারুন বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে জানান, এসব কারখানার পরিশোধিত না করা রাসায়নিক ও ক্ষতিকর তরল বর্জ্য সরাসরি নিকটস্থ নদীতে ফেলা হয়। পরবর্তীতে জোয়ার-ভাটার কারণে তা ছোট ছোট খালের মাধ্যমে সমগ্র সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে মাটি ও পানি দূষিত করছে। এর ফলে বনের অনেক স্থানে নতুন করে চারা গজানো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং জলে তেলের মাত্রা বাড়ায় জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্যাপক গণআপত্তি ও তীব্র সমালোচনা উপেক্ষা করে ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর বনের গা ঘেঁষে চালুকৃত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এখন সুন্দরবনের জন্য অন্যতম বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো প্রকার পরিশোধন ছাড়াই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষাক্ত বর্জ্যযুক্ত পানি সুন্দরবনের মইদারা ও পশুর নদে গিয়ে পড়ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মারাত্মক ধোঁয়া এবং নদীতে নির্গত বর্জ্য বনজ বাস্তুতন্ত্রের চরম ক্ষতি সাধন করছে।
তবে এসবের মাঝেও আশার বাণী শুনিয়েছেন প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী। তার দাবি, সম্প্রতি বন সংক্রান্ত অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে সার্বিকভাবে সুন্দরবনের গাছপালা ও প্রাণী বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে। এমনকি বাঘের সংখ্যার পাশাপাশি বাঘের শিকারযোগ্য অন্য প্রাণীদের বংশবৃদ্ধিও ঘটেছে।
বন বিভাগের সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়ে তিনি আরও জানান, সুন্দরবনকে নিরাপদে রাখতে বনকর্মীদের নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয়’ গড়ে তোলা হচ্ছে। আগামী দিনে বনের নিরাপত্তা জোরদারে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বহুলাংশে বাড়ানো হবে।
সময়ের আলো/জেডি