বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে কওমি ঘরানার ইসলামিক দলগুলোকে বের করে আনতে চায় হেফাজতে ইসলাম। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এই সংগঠন চায় জামায়াতের সঙ্গে যাতে কোনো ইসলামপন্থি যুক্ত দল না থাকে। বিপরীতে হেফাজতে ইসলাম সাতটি দলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম করার উদ্যোগ নিয়েছে। ৩ আগস্ট সাত দলের কাছ থেকে ঐক্যের রূপরেখা জানতে চেয়েছে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্ব।
কওমি মাদরাসাভিত্তিক সাতটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এর মধ্যে তিনটি দল জামায়াতে ইসলামীর জোটে এবং একটি বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে মতবিনিময়ে এসব আলোচনা হয়েছে। আগস্টের বৈঠকে তা উত্থাপন করা হবে। ওই বৈঠকে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও ছিল।
বিএনপির জোটে থাকা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও ছিল। ছিল জামায়াতের জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত মজলিস। জামায়াতের জোট থেকে সম্প্রতি বেরিয়ে যাওয়া খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী ঐক্যজোট প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
চরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী আন্দোলন বাদে বাকি ছয়টি দল আগে থেকেই হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত। এই দলগুলোর নেতারা হেফাজতের পদধারী নেতা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করেন অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের নেতারা। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলেও ফতোয়া জারি করেন। তবে এতে জোট ছাড়েনি জামায়াতের সঙ্গে থাকা দেওবন্দি উসুলে পরিচালিত দলগুলো।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন জোট করে জামায়াতের সঙ্গে। প্রথম তিনটি দলকে জামায়াত আসন ছাড়লেও খেলাফতকে ছাড়েনি। এককভাবে ভোট করা এই দলটি নির্বাচনের পর জোট ছেড়েছে। দলটিকে জামায়াত উচ্চকক্ষে আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। উচ্চকক্ষ অনিশ্চিত হওয়ায় তারা একাই পথ চলতে চায়।
বাংলাদেশ খেলাফত দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়ী হয়েছে। কোনো আসনে জিততে পারেনি নেজামে ইসলাম। খেলাফত মজলিস সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট না ছাড়লেও তারা ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে যাবে না। ফলে দলটি আর নেই জামায়াতের সঙ্গে।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রব্বানী সময়ের আলোকে বলেন, নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনার পর আগামী ৩ আগস্ট সাতটি দল তাদের নিজস্ব প্রস্তাবনা ও মতামত লিখিতভাবে তুলে ধরবে। বিষয়টি সমন্বয় করছেন হেফাজতের মহাসচিব শায়েখ সাজিদুর রহমান ও নায়েবে আমির মাওলানা জসিম উদ্দিন। তাদের কাছে দলগুলো ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রস্তাবনা জমা দেবেন।
এরপর হেফাজত নেতৃবৃন্দ সবার সঙ্গে আলোচনা করে জোটের কাঠামো চূড়ান্ত করবে। তিনি বলেন, মূলত উদ্দেশ্য হলো হেফাজত চায় কওমি ঘরানার দলগুলো এক ছায়াতলে থাকুক। কেননা হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটি কওমি মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। হেফাজত চায় না কওমি ঘরানার দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হোক। কওমিভিত্তিক ইসলামি দলগুলো যাতে একত্রে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত করে, সে জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ। হেফাজতের শীর্ষ নেতারাই বিভিন্ন ইসলামিক দলের নেতৃত্বে আছেন। এ জন্য বলতে পারেন সাত দলকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হেফাজতে ইসলামী অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছে।
হেফাজতের আরেকজন নেতা সময়ের আলোকে বলেন, আমরা চাই জামায়াতের সঙ্গে কোনো ইসলামি দল না থাকুক। কওমি ঘরানার দলগুলো কেন জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত থাকবে? কওমিরা তো জামায়াতকে পছন্দ করে না। তাদের দর্শন-আদর্শ আমাদের সঙ্গে মেলে না। আমরা চাই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যাতে কোনো ইসলামিক দল না থাকে। ইতিমধ্যে একটি দল বেরিয়ে এসেছে। আরও কয়েকটি দল তাদের জোট থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সূত্র জানায়, জমিয়ত নেতারা প্রস্তাব করেন ইসলামপন্থি দলগুলোকে জামায়াত ছাড়তে হবে। তখন অন্যরা বলেন, তা হলে জমিয়তকে বিএনপি ছাড়তে হবে। জমিয়ত নেতারা বলেন, অন্যরা জামায়াত ছাড়লে তারা বিএনপি ছাড়তে প্রস্তুত।
জমিয়তের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী সময়ের আলোকে বলেছেন, সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ থাকতে একমত হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় তা হবে, এ নিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। সবাই তা হেফাজত আমিরকে দেবে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খেলাফতে মজলিস। তবে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার ঘোষণা না দিলেও এ সিদ্ধান্তের ফলে কার্যত জামায়াতের সঙ্গে থাকছে না দলটি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এককভাবে কর্মসূচি করার কথা জানিয়েছে দলটি।
গত শনিবার রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে খেলাফতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সংসদে দলটির একমাত্র এমপি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১১ দলীয় ঐক্য ছিল মূলত নির্বাচনি সমঝোতা। নির্বাচন শেষ হয়ে যাওয়ায় এই ঐক্যের কার্যকারিতা বস্তুত শেষ হয়ে যায়। তবু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ১১ দলীয় কিছু কর্মসূচিতে খেলাফত মজলিস অংশ নেয়। এখন থেকে ১১ দলীয় ঐক্যের যাবতীয় কর্মসূচি থেকে খেলাফত মজলিস বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের সময়ের আলোকে বলেন, আমরা জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে এসেছি। এটির কারণ আমরা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়েছি। আর সাত দলীয় জোটের উদ্যোগ এখনও অঙ্কুরে। আমরা মতামত তুলে ধরব ৩ আগস্ট। তারপর সিদ্ধান্ত হবে। কীভাবে ঐক্য হবে, কীভাবে সামনের পথচলা হবে, এসব ঠিক হবে আগে।
হেফাজতের সঙ্গে জামায়াতের বৈরিতা নতুন নয়। জাতীয় নির্বাচনের আগে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে একটি ‘ভণ্ড ইসলামী দল’ ও মওদুদীবাদী আকিদার অনুসারী হিসেবে আখ্যা দেন। সেই সঙ্গে দলটিকে ভোট দেওয়া মুসলমানদের জন্য হারাম ও জায়েজ নয়। ভোটের আগে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং দলটির আমির সৈয়দ রেজাউল করীমকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
সময়ের আলো/এসএকে