মহেশখালীতে গত মঙ্গলবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি এখনও পুরোপুরি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে আবাসিক, শিল্প, যানবাহন খাত। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। গ্যাসের অভাবে রান্নার চুলা জ্বলছে না দিনের বেশিরভাগ সময়।
তিতাস বলছে, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের আওতাধীন এলাকায় কয়েক দিন তীব্র স্বল্প চাপ বিরাজ করবে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, আগুনে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ক্যাবল এবং কিছু যন্ত্রাংশ পুড়ে গেছে। যুক্তরাজ্য থেকে আসা প্রকৌশলীরা মেরামত করতে বিরামহীন কাজ করছেন। কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনা লাগতে পারে। দ্রুত চালুর জন্য এক্সিলারেট এনার্জিকে বলা হয়েছে। তবে তারা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানাতে পারেনি।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যুক্তরাজ্য থেকে আসা ৩ জন প্রকৌশলী এবং বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা রাত-দিন কাজ করছেন। আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে আংশিক চালু করা সম্ভব হবে। তবে পূর্ণ মাত্রায় সরবরাহ চালু করতে ১ থেকে ২ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এখনও নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। ততদিন দেশে গ্যাস সংকট থাকবে।
রান্নার চুলা জ্বলছে না : অন্যদিকে চলমান গ্যাস সংকটে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মগবাজার, বাড্ডা, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, কাজীপাড়া, পশ্চিম তেজতুরী বাজার ও বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা তিন বেলা রান্না করতে না পেরে বিপাকে পড়ছেন। কোথাও নিভু নিভু আবার কোথাও একেবারেই চুলা জ্বলে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চাপ এতটাই কম থাকছে যে রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। অনেক স্থানে আবার গভীর রাতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে বাসিন্দাদের না ঘুমিয়ে রান্না করে রাখতে হয়। অনেকে আবার হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। এতে মাসিক খরচে টান পড়ছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলো হতে আরএলএনজি সরবরাহ প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি হ্রাস পাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাস গ্যাস অধিভুক্ত এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের তীব্র স্বল্প চাপ বিরাজ করবে।
পেট্রোবাংলা বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যদিও গত বছর থেকে দিনে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। অগ্নিদুর্ঘটনায় এলএনজির একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে।
পাম্পে সংকট : রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক গ্যাস নিতে পারছেন না। এতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশনে স্বাভাবিক গতিতে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একটি গাড়িতে গ্যাস ভরতেই অনেক সময় লেগে যায়। কোথাও কোথাও সাময়িক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সড়কেও। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা কমে গেছে। অনেক চালক পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছেন না। এতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চালকদের অভিযোগ, এমনিতেই গ্যাসের চাপ কম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ফুল গ্যাস পাওয়া যায় না। তার ওপর আবার টাকাও বেশি দিতে হচ্ছে।
শিল্পে সংকট : অন্য খাতের মতো গ্যাস সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। বাধ্য হয়ে অনেকেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে অন্য জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রফতানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে জটিলতা দেখা দেবে।
অন্যদিকে গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। কেননা, সবচেয়ে বেশি গ্যাস লাগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাস সংকটে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এসি শিল্প গ্রুপ ও এসজিএলের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। এই সংকট শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, এটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা, এর ওপর কারও হাত নেই। আমাদের চাহিদার চেয়ে গ্যাস সংকট রয়েছে। এখন একটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। মেরামত করা হচ্ছে। ততদিন সংকট থাকবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, শর্টসার্কিটের কারণে ভাসমান টার্মিনালের ক্যাবল পুড়ে গেছে। বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ করছেন। আরও সময় লাগবে। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, মেরামত করার জন্য ইংল্যান্ড থেকে আমরা প্রকৌশলী নিয়ে এসেছি। তারা বিরামহীন কাজ করছেন। এখানে টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে। একটু অপেক্ষা করতে হবে। ভাসমান টার্মিনালটি দ্রুত চালু করার সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/এসএকে