দামের দায় ভোক্তার ঘাড়ে

এসএম আলমগীর

জাতীয়

একদিকে জ্বালানি তেলের দামে আগুন, অন্যদিকে ফুরিয়ে আসছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তহবিল। এরই মধ্যে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও

2026-09-22T00:38:17+00:00
2026-09-22T00:45:35+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
দাম না বাড়িয়ে অন্য খাতে ব্যয় কমানো ও অপচয় বন্ধের পরামর্শ
দামের দায় ভোক্তার ঘাড়ে
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৮ এএম  আপডেট: ২২.০৯.২০২৬ ১২:৪৫ এএম
সময়ের আলো গ্রাফিক
একদিকে জ্বালানি তেলের দামে আগুন, অন্যদিকে ফুরিয়ে আসছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তহবিল। এরই মধ্যে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও বাড়ছে। গত ছয় মাসে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করায় বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ কোটি টাকা। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছরে জ্বালানি খাতে সরকারকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। গত অর্থবছরেও এ খাতে সরকারকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

এরই মধ্যে গত রোববার রাতে এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এতে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেনের দাম হয়েছে ১৬৫ টাকা। তবে দাম বাড়ানোর পরও বিপিসির সংকট কাটেনি। বরং প্রকাশ পেয়েছে এর তীব্র আর্থিক চাপের চিত্র।

জ্বালানি বিভাগের সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এখন ২০৫ টাকা। দেশে বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম দামে। ফলে প্রতি লিটারে লোকসান ৯০ টাকার বেশি। সরকারি হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলে এখনও ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানির দাম না বাড়ালে শুধু ডিজেলেই ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানিতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতো।

ফুরিয়ে আসছে বিপিসির টাকা : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ব্রেন্ট ক্রুড ১০৮ ডলারে ওঠে। বর্তমানে তা ১০২ ডলারে নেমেছে। তবু আমদানি ব্যয় এখনও অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে তেল আমদানির অর্থ জোগাতে গিয়ে বিপিসির তহবিল প্রায় শেষের পথে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসি জানিয়েছে, ব্যাংকে তাদের অবশিষ্ট আছে মাত্র ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। এ অর্থ দিয়ে কোনোভাবে সেপ্টেম্বর মাস চালানো যাবে। অক্টোবরের যেকোনো সময় তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রথমবারের মতো তেল আমদানিতে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসি নিজের তহবিল থেকে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে লোকসান ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। চলতি সেপ্টেম্বরে লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। চলতি বছর সরকার এলএনজি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ভর্তুকি দিলেও তেল আমদানিতে এক টাকাও ভর্তুকি দেয়নি। ফলে পুরো চাপ পড়ে বিপিসির ওপর।

লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে। তবে তাতেও সংকট পুরোপুরি কাটবে না। বিশ্ববাজারে দাম না কমলে প্রতি বছর সরকারকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তা না হলে আবারও দাম বাড়াতে হবে।

দাম না বাড়িয়ে বিকল্প কী : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, একবারে লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়িয়ে সরকার জনগণের ওপর জুলুম করেছে। তার মতে, অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে জ্বালানি খাতে অর্থ দেওয়া, মেগা প্রকল্পের ব্যয় সাময়িকভাবে কমানো এবং জ্বালানি আমদানির শুল্ক কমানোর সুযোগ ছিল। আমলাদের চাপে তড়িঘড়ি দেওয়া নতুন পে-স্কেল অন্তত এক বছর পর বাস্তবায়ন করা হলেও সরকারের অর্থের চাপ কমত বলে মনে করেন তিনি।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, রাজস্ব আয় কমে যাওয়া ও ব্যয় বাড়ার মধ্যে সরকারকে জ্বালানির দাম বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। নতুন পে-স্কেলেও সরকারের ব্যয়ের বোঝা বেড়েছে। আগামী মাসে আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসার কথা; জ্বালানির দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর চাপও রয়েছে।

তার মতে, বিপিসি গত কয়েক বছর অনেক টাকা লাভ করে সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে। ওই অর্থ বিপিসির হাতে থাকলে এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতো। তিনি বলেন, ভারতে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ১৫ দিন পরপর জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়। দাম বাড়লে বাড়ানো এবং কমলে কমানোর এ পদ্ধতি বাংলাদেশেও চালু করা প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভর্তুকি কমাতে একসঙ্গে তিনটি বিষয়ে কাজ করা দরকার— স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়, জ্বালানির চাহিদা কমানো এবং অপচয়-পাচার বন্ধ করা। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত দাম সমন্বয় করা হলে এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে না। এতে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি কমতে পারে।

দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর ৬৫ শতাংশই ডিজেল। পরিবহন ও সেচে ডিজেলের ব্যবহার বেশি। নৌ ও রেলপথে পণ্য পরিবহন এবং কৃষিতে ডিজেলচালিত পাম্পের বদলে সৌরচালিত পাম্প ব্যবহার করে চাহিদা কমানো সম্ভব। ইডকল ইতিমধ্যে ৩ হাজার সোলার পাম্প বসিয়েছে। প্রতিটি পাম্পে বছরে ১৫ হাজার লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়। দেশের ১৩ লাখ পাম্পের ৩০ শতাংশ সোলার করলে বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। 


সরকারি হিসাবে বছরে ৮-১০ শতাংশ জ্বালানি পাচার ও চুরি হয়। ডিজিটাল মিটারিং ও জিপিএস ট্র্যাকিং চালু করলে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।

৯ মাসে দাম বেড়েছে ৩২-৩৬ শতাংশ : চলতি বছরের শুরুতে প্রতি লিটার ডিজেল ১০২, কেরোসিন ১১৪, পেট্রোল ১১৮ এবং অকটেন ১২২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে চার ধরনের জ্বালানির দাম ২ টাকা করে কমিয়ে যথাক্রমে ১০০, ১১২, ১১৬ ও ১২০ টাকা করা হয়। মার্চেও এ দাম বহাল ছিল।

১৯ এপ্রিল দাম বাড়িয়ে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩০, পেট্রোল ১৩৫ এবং অকটেন ১৪০ টাকা করা হয়। জুনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে অন্য তিনটির দাম ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। ফলে দাম দাঁড়ায় যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে এ দামই ছিল। সবশেষ ২০ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়।

ফলে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৩ টাকা বা ৩২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কেরোসিন ৪১ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পেট্রোল ৪২ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং অকটেন ৪৩ টাকা বা ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।

বাড়বে মূল্যস্ফীতির চাপ : গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পেট্রোল পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন, খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতে তা ছড়িয়ে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি বেশি, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়ানোয় মূল্যস্তরে নতুন চাপ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বেশি। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত পরিবহন, সেচ ও সরবরাহ ব্যয় জড়িত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে একাধিক ব্যয়ের উৎসে চাপ পড়ে। ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা ভবিষ্যতে আরও দাম বাড়ার আশঙ্কায় আগেভাগে পণ্যের দাম ও মজুরি সমন্বয় করলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

জ্বালানির দাম এক লাফে ২০ টাকা বাড়ার ফলে পরিবহন ভাড়া, কৃষির উৎপাদন ব্যয় ও শিল্পের খরচ বাড়বে। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল আনতে ৫ হাজার টাকা বেশি লাগতে পারে, গাজীপুরের একটি গার্মেন্টস কারখানায় জেনারেটরের মাসিক খরচ বাড়তে পারে ৬ লাখ টাকা এবং একজন কৃষকের বিঘাপ্রতি সেচ খরচ বাড়তে পারে ৭০০ টাকা। 

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশে উঠতে পারে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত এবং ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারাই এর চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবেন। ২৫ হাজার টাকা বেতনে সংসার চালানো ব্যক্তির মাসিক বাড়তি খরচ হতে পারে ৪-৫ হাজার টাকা। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সরাসরি পৌঁছাবে দেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবনে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   দামের দায় ভোক্তার ঘাড়ে 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: