গ্রাফিক : সময়ের আলো তুরস্কে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলন (কপ-৩১) শুরু হচ্ছে আজ। সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের বিশ্বনেতাদের অধিবেশনে অংশ নিতে মঙ্গলবার তুরস্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এই অধিবেশনে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে— অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা, অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে জলবায়ু সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
এবারের সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে বাংলাদেশের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ঋণের পরিবর্তে অনুদান এবং জলবায়ু তহবিলের অর্থ সহজে পাওয়ার নিশ্চয়তা চাইবে বাংলাদেশ।
আনতালিয়ায় ৯ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে কপ-৩১। তবে ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বনেতাদের উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দুদিনের কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সম্মেলনের প্রথম দিনেই বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা, অভিযোজন সক্ষমতা এবং পরিবেশ রক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ন্যায্য অধিকার আদায়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
পাঁচ দফায় বাংলাদেশের অগ্রাধিকার : সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থানের মূল ভিত্তি হবে জলবায়ু ন্যায্যতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সরকারের বক্তব্য এবং সম্মেলনকেন্দ্রিক বাংলাদেশের কৌশল অনুযায়ী পাঁচটি বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রথমত জলবায়ু অর্থায়নে ঋণের পরিবর্তে অনুদান নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের যুক্তি, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে অবদান খুবই কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে দেশটিকে।
ফলে ক্ষতি মোকাবিলায় নতুন করে ঋণের বোঝা চাপানো ন্যায্য নয়। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো। তৃতীয়ত, অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা। পঞ্চমত, বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জবাবদিহির আওতায় আনা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ২ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশ জলবায়ু সহনশীলতা ও অভিযোজন কার্যক্রমে নিজেদের অর্জন তুলে ধরবে। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর কাছে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন এবং বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার দাবি জানাবে।
সাইড লাইনে বৈঠকে গুরুত্ব : গত ১৮ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও টেকসই উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
জাতিসংঘের প্রকাশিত সম্মেলনের সূচি অনুযায়ী, ১১ নভেম্বর সকাল থেকেই রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় রাখা হয়েছে। ফলে সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার সুযোগ পাবেন প্রধানমন্ত্রী। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোন কোন দেশের নেতার বৈঠক চূড়ান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
জলবায়ু উদ্যোগ তুলে ধরবে সরকার : মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্মেলনে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক উদ্যোগগুলোও তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কর্মসূচি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এবারের সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটি কারণে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রত্যাশা অনুযায়ী আসছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরে এবারের সম্মেলনে লস অ্যান্ড ড্যামেজে অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানাবে ঢাকা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন চাইবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে