ছবি : সংগৃহীত আগামী বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। ডিসেম্বরের মধ্যে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির কার্যক্রম শেষ করে জানুয়ারিতে সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরপর জানুয়ারিতে সংসদের অধিবেশনে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
কিন্তু সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা এগোলেও কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বিশেষ কমিটি। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তাকে কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে, সংসদে উচ্চকক্ষ আদৌ প্রয়োজন কি না এবং থাকলে এর ক্ষমতার পরিধি কতটুকু হবে— এসব প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে জানুয়ারিতে সংসদে বিল উত্থাপনের সময়সীমা সামনে থাকলেও সংবিধান সংশোধনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
সংসদীয় বিশেষ কমিটির সূত্রগুলো বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নীতিগত ঐকমত্য থাকলেও এর কাঠামো ও প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। কমিটির বৈঠকগুলোতে আইনবিদ ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতিসহ সংবিধান সংশোধন নিয়ে একাধিক প্রস্তাব এসেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তাব থাকলেও সেই কমিটির মাধ্যমে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হলে পরবর্তী বিকল্প কী হবে, তা নিয়েই মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব নিয়েও রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক রয়েছে। উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার একটি ধারণা কমিটির বৈঠকে আলোচনায় এলেও এর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। বিএনপি সরকার বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদের মাধ্যমে সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে পরিবর্তন চেয়ে আন্দোলনে নেমেছে। বিরোধী দল সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে অংশ না নেওয়ায় রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই। কিন্তু এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতি এবং সরকারের কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি জায়গায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত সামনে এসেছে।
জুলাই সনদ অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া বা অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর একটি সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা হবে। এই কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি। কমিটি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে যোগ্য ব্যক্তির নাম আহ্বান করবে। পাশাপাশি নিজেরাও নাম অনুসন্ধান করতে পারবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আলোচনা করে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা। প্রথম দফায় ঐকমত্য না হলে সরকারি ও বিরোধী দলীয় জোটের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত নামের তালিকা নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে সমঝোতার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাতেও সমাধান না হলে বিচার বিভাগের দুজন প্রতিনিধিকে যুক্ত করে সাত সদস্যের কমিটির মাধ্যমে র্যাঙ্কড চয়েজ পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এই শেষ পর্যায়ের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। এ জায়গাতেই জুলাই সনদের প্রস্তাব নিয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত হওয়ার পর বাছাই কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে সর্বোচ্চ ১৫ জন উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে অথবা মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়েছে।
তবে সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা না হলে কীভাবে নিরপেক্ষ ব্যক্তি নির্বাচন করা হবে সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন সম্ভব হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প কাঠামো হিসেবে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে প্রধান উপদেষ্টা করার ধারণাও আলোচনায় এসেছে সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির বৈঠকে। কিন্তু এ প্রস্তাবের সঙ্গে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। সংসদে উচ্চকক্ষ প্রয়োজন আছে কি না, থাকলে এর গঠন, সদস্য নির্বাচন এবং ক্ষমতার পরিধি কী হবে— এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে বিবেচনার প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ধারণার বিরোধিতা করেছেন সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার। তার মতে উচ্চকক্ষের স্পিকারকে এ দায়িত্ব দেওয়া হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। কারণ তিনি হবেন রাজনৈতিক ব্যক্তি। এতে জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সাংবিধানিক বিতর্ক রয়েছে। একদিকে সংসদে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কক্ষের মাধ্যমে পর্যালোচনা ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার যুক্তি রয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচিত সংসদের বাইরে আরেকটি কক্ষকে কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইনবিদদের কেউ কেউ। উচ্চকক্ষের সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জাতীয় ভোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সদস্য মনোনয়ন হবে কি না এবং নিম্নকক্ষের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারিত হবে সেই প্রশ্নও উঠেছে বিশেষ কমিটির বৈঠকে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, অনির্বাচিত উচ্চকক্ষকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাস করা আইন বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হলে তা সংবিধানের ৭ ও ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগণের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। সে সময় সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করার বিধান রাখা হয়েছিল। তাকে পাওয়া না গেলে পর্যায়ক্রমে অন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, পরে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কাউকে নিয়োগ এবং সবশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির নিজের দায়িত্ব নেওয়ার বিধান ছিল।
কিন্তু ২০০৬ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়। এর পরিণতিতে রাজনৈতিক সংঘাত ও ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তবে সম্প্রতি আপিল বিভাগের রায়ে এ ব্যবস্থাসংক্রান্ত বিধান পুনরুজ্জীবনের পথ তৈরি হয়।
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকাও সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি সদস্যপদ রাখা হলেও তারা কোনো প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানানো হলেও সাড়া দেয়নি বিরোধী দল।
বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের বক্তব্য গণভোটের রায় ও ৪৮টি সংস্কার ইস্যু বাস্তবায়নের প্রশ্নে তারা ছাড় দেবে না। সংসদ ও রাজপথে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট সংবিধান সংস্কারের পক্ষে পড়েছিল। বিরোধী দল এ গণভোটের রায়কে সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণভোট এবং এর পেছনে থাকা রাষ্ট্রপতির আদেশের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন-সংক্রান্ত আদেশ জারির এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। ফলে সেই ভিত্তির ওপর জারি করা আদেশটি আইনগতভাবে টেকে না।
বিপরীতে সরকারের অবস্থান সংবিধানের বিদ্যমান বিধান অনুসরণ করেই সংশোধন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির কার্যক্রম শেষ করে জানুয়ারিতে সংসদে বিল উত্থাপনের চেষ্টা করা হবে। তিনি জানান, তারা অতীতের সরকারের মতো একতরফাভাবে কিছু করতে চান না বলেই বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ও মতামত চাইছেন। সব পক্ষের মতামত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে বিশেষ কমিটি সমন্বিত প্রতিবেদন সংসদে পেশ করবে। তিনি বলেন, সংবিধানকে সংস্কার করার কোনো বিধান না থাকায় সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে কোনো আইনি সংকট তৈরি হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদ সার্বভৌম। তাদের প্রত্যাশা সংবিধান সংশোধন বিল সংসদে উত্থাপিত হলে সেখানে আলোচনায় বিরোধী দল অংশগ্রহণ করবে এবং তারা তাদের মতামত দেবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে