রাজারবাগে রেশন বিক্রির হাটরাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ৩ নম্বর গেটের সামনেই বসেছে রেশন বিক্রির অঘোষিত হাট। পুলিশ সদস্যরা ভেতর থেকে চাল, আটা, তেল ও চিনির বস্তা ট্রলিতে করে গেটের সামনে নিয়ে আসছেন। সেখানে অপেক্ষমাণ ডিলারদের সঙ্গে দরদাম করে পণ্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন। বিনিময়ে নগদ টাকা নিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছেন কর্মস্থলে। এভাবে প্রতিদিন শত শত পুলিশ সদস্যের রেশনের পণ্য বিক্রির দৃশ্য দেখা যায়। ডিলারদের কাছ থেকে এসব পণ্য কিনে নিচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। পরে রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে সেগুলো।
রোববার সরেজমিন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ৩ নম্বর গেটে গিয়ে দেখা যায়, গেটের সামনে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ভিড়। পুলিশ সদস্যরা পণ্যবাহী ট্রলিতে করে বস্তাভর্তি রেশন নিয়ে আসছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দরদাম শেষে চাল, আটা, তেল ও চিনির বস্তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। টাকা গুনে নিয়ে আবার ভেতরে চলে যাচ্ছেন তারা। পুলিশের পোশাক পরা ও সাদা পোশাকের উভয় ধরনের সদস্যকেই এভাবে পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়। এ সময় গেটের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন কনস্টেবল আমিনুল। তবে সামনের জটলা নিয়ন্ত্রণে তাকে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
কেউ কেউ গেটের সামনে পণ্য বুঝিয়ে দিলেও কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে রাস্তার অন্য পাশে গিয়ে ব্যবসায়ীদের হাতে পণ্য তুলে দিতে দেখা যায়। সেখানে রেশনের বস্তা স্তূপ করে রাখছেন ডিলাররা। পরে খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামে সেগুলো কিনে রিকশা ও ভ্যানে করে নিয়ে গেছেন। ডিলারদের পাশাপাশি অনেক নারী-পুরুষকেও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে দেখা যায়। সব মিলিয়ে পুলিশ লাইনের সামনে রীতিমতো বাজারের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এতে ওই সড়কে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মাসের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত রেশনের পণ্যের সরবরাহ ও কেনাবেচা বেশি হয়।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে মোটা চাল কেজিপ্রতি ৩৯ টাকা, আটা ৪৪ টাকা, চিনি ১০৫ টাকা এবং মসুরের ডাল ১২৫ টাকা দরে কেনেন ডিলাররা। পরে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে চালের মণ ১ হাজার ৬০০ টাকা, সানশাইন কোম্পানির পাঁচ কেজির আটার প্যাকেট ২৩০ টাকা, দুই লিটার রূপচাঁদা তেল ৪০০ টাকা, দুই কেজির মসুর ডালের প্যাকেট ২৬০ টাকা এবং লাল চিনি কেজি ১১০ টাকা দরে বিক্রি করেন তারা। এতে প্রতি কেজিতে এক থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত লাভ করেন ডিলাররা। খুচরা ব্যবসায়ীরাও ক্রেতাদের কাছে কেজিপ্রতি এক-দুই টাকা লাভে পণ্য বিক্রি করেন। কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অন্য পণ্য বিক্রি করলেও চিনি নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে দিতে দেখা যায়।
এদিন কনস্টেবল এন্তাজিল, রনি, মাইনুদ্দিন, মহিউদুজ্জামান, মোসলেহ ও সবুজসহ অনেক পুলিশ সদস্যকে রেশনের পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়। তাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সাদা পোশাকে পণ্য বিক্রি করা এক সদস্যের কাছে বিক্রির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আরে ভাই, এসব টানাটানি (বহন) ভালো লাগে না, তাই বিক্রি করে দিচ্ছি।’ আরেক সদস্য বলেন, ‘একা থাকি, তাই এত কিছু লাগে না। বিক্রি করে দিলে কিছু টাকা পাইলাম।’
পণ্যের মান খারাপ হওয়ার কারণে বিক্রি করছেন কি না জানতে চাইলে এক পুলিশ সদস্য বলেন, ‘না ভাই, সব পণ্যই ভালো। তবে চালটা মোটা, এটাতে একটু সমস্যা।’ তিনি জানান, অনেকে এসব মোটা চাল মেশিনে চিকন করে বেশি দামে বিক্রি করেন।
রেশন কিনে নেওয়া এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা ভেতরে যাই না। তারাই (পুলিশ) গেটে নিয়ে আসে। তখন আমরা কিনে নিই। সব পণ্যতেই এক-দুই টাকা লাভ করে খুচরা দোকানদারদের কাছে বিক্রি করি। এখানে ভালোই একটা ব্যবসা হয়।’
এ সময় এক ডিলারকে পুলিশ কর্মকর্তার উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘সার্ভারে সমস্যা ছিল কিছুক্ষণ। এখন যান, এখন হয়তো ঠিক হয়েছে।’ বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, রেশন বিতরণের জন্য যে সার্ভারে তথ্য এন্ট্রি করা হয়, সেটিতে সমস্যার কারণে কিছুক্ষণ পণ্য দেওয়া বন্ধ ছিল। পরে ঠিক হয়েছে বলে শুনেছেন। এদিকে গেটের সামনে দরদাম করে পণ্যের পরিমাণ অনুযায়ী বস্তা নিয়ে যেতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। এ ব্যস্ততায় সড়কে যান চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।
গেটের সামনে থেকে চাল কিনে মাথায় করে নিয়ে যাওয়া এক দোকানিকে অনুসরণ করে দেখা যায়, তিনি মূল সড়ক পার হয়ে বিপরীত পাশের একটি গলিতে ঢোকেন। পরে ৬ নম্বর শান্তিবাগের ৩ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডের ব্রাদার্স ট্রেডিং নামের একটি মুদি দোকানে চালের বস্তা নামিয়ে রাখেন। এরপর অন্য একটি বস্তায় চাল ভরতে দেখা যায় তাকে। ওই দোকানে রেশনের বেশিরভাগ পণ্যই বিক্রি হতে দেখা যায়। তবে চাল, আটা, চিনি ও তেল কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন দোকানি। পাশের আইয়ুব স্টোরেও এসব পণ্য বিক্রি হতে দেখা গেছে।
শুধু রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকেই নয়, এসবি ও সিআইডি অফিসের রেশনের পণ্যও বাইরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে সাধারণ ডিলাররা সেখানে প্রবেশ করে পণ্য কিনতে পারেন না। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এসবি ও সিআইডির রেশনের মাল আমরা গিয়ে কিনতে পারি না। সেখানে সবাই ঢুকতে পারে না। শুধু ঠিকাদাররা মাল নেন। পরে তারাই বাইরে বিক্রি করেন।’
পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর রেশনের পণ্য বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হতে দেখা যায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ট্রাকে করে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। মিরপুর চিড়িয়াখানা রোড, মিরপুর-১ ও ইসিবি চত্বর এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকানেও এসব পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। উত্তর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা দোকানেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামসংবলিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও এসব পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যক্তিগতভাবে রেশনের পণ্য বাইরে বিক্রির কোনো নিয়ম নেই। এভাবে প্রকাশ্যে বিক্রির ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া বিভাগের এআইজি কামারুম মুনিরা সময়ের আলোকে বলেন, ‘কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে রেশনের পণ্য বিক্রি করে, সেটিও শৃঙ্খলাপরিপন্থী। আর যদি এভাবে পুলিশ লাইনের সামনে ওপেন বিক্রি হয়, তা পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। এমনটি হলে আমি এখনই ডিসিপ্লিনারি সেকশনকে জানাচ্ছি। অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে