খাইবার মিসাইলে বরবাদ মার্কিন মিত্ররা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানের খাইবার শেকান মিসাইল। তেহরানের অস্ত্র ভান্ডারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এটি। সস্তা, সহজে স্থানান্তরযোগ্য ও লক্ষ্যভেদে নিখুঁত এই অস্ত্রের পাল্লা

2026-07-27T03:40:42+00:00
2026-07-27T03:40:42+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
খাইবার মিসাইলে বরবাদ মার্কিন মিত্ররা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৩:৪০ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ইরানের খাইবার শেকান মিসাইল। তেহরানের অস্ত্র ভান্ডারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এটি। সস্তা, সহজে স্থানান্তরযোগ্য ও লক্ষ্যভেদে নিখুঁত এই অস্ত্রের পাল্লা অন্তত ৯০০ মাইল। সম্প্রতি একের পর এক জটিল হামলায় এর ব্যবহার শুরু করেছে ইরান। আর এর মধ্য দিয়েই তারা প্রমাণ করে দিচ্ছে আমেরিকার বিরুদ্ধে তারা কৌশল বদলাতে পারদর্শী এক প্রতিপক্ষ।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান। মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তারা এখন এক অভিনব কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে নানা রকম উড্ডয়ন পথ (ফ্লাইট পাঠ), রণকৌশল ও গতির মিশ্রণ ঘটিয়ে হামলা চালাচ্ছে তারা।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী একজন মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেন, যুদ্ধ চলাকালীন ছোড়া বেশিরভাগ খাইবার শেকানই ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলো। তবে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের আগের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরতে হতো। কিন্তু খাইবার শেকানকে আগে থেকেই জ্বালানিপূর্ণ করে রাখা যায়। এরপর দ্রুত ট্রাক বা অন্য কোনো লঞ্চার যানে তুলে ছুড়ে মারা যায়। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিতে ওত পেতে থাকা মার্কিন বা ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের নজর এড়াতেই এই কৌশল।

কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রের কয়েকটি সংস্করণের সামনের অংশে ছোট্ট ইঞ্জিনযুক্ত ওয়ারহেড আছে। উড্ডয়নের চূড়ান্ত ধাপে বিস্ফোরকভর্তি এই ওয়ারহেড মূল কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর ঘণ্টায় ৬ হাজার মাইল বেগে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যাওয়ার সময়ও এটি নিজের দিক পরিবর্তন করতে পারে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঊর্ধ্বাকাশে বা মহাকাশে পৌঁছে যাওয়ার পর সেখান থেকে তীব্র বেগে নিচের দিকে লক্ষ্যবস্তুতে আছড়ে পড়ে। তবে সব ক্ষেপণাস্ত্র এভাবে মাঝপথে গতিপথ বদলাতে পারে না। খাইবার শেকান নিয়ে গবেষণা করা সামরিক বিশ্লেষকরা বলেন, রাডারের চোখ ফাঁকি দেওয়া এবং ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে ক্ষেপণাস্ত্রটি অন্য অনেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁতভাবে নিজের ট্র্যাজেক্টরি বা গতিপথ বদলাতে সক্ষম।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, যুদ্ধজুড়েই নিজেদের রণকৌশলে বদল আনছে ইরান। স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রিত খাইবার শেকান দিয়ে যেসব জায়গায় হামলা চালানো হচ্ছে, ঠিক একই লক্ষ্যবস্তুতে এখন হাইস্পিড অ্যাটাক ড্রোন ও অপেক্ষাকৃত কম আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়ছে তেহরান।

কর্মকর্তারা বলেন, যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। বাদ যাচ্ছে না আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত রাডারও। ইরানের এই আগ্রাসী কৌশল মার্কিন সেনাদের আরও বড় ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত আর্মি জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, এ থেকে একটা ব্যাপারই স্পষ্ট যে ইরান চারপাশের পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। তারা শিখছে। আর আমাদের ঘায়েল করার নতুন নতুন কৌশল বের করছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনীর ড্রোন সক্ষমতা অত্যন্ত উন্নত। দীর্ঘকাল ধরে তাদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট কর্মসূচি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হিসাব অনুসারে যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের হাতে ২ হাজারের বেশি খাইবার শেকান ও অন্যান্য মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিঞ্জের ধারণা, ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোতে লুকিয়ে রাখা যন্ত্রাংশ জোড়া লাগিয়ে তারা আরও নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে থাকতে পারে। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন তৈরির মূল উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ইরানি কৌশলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, যুদ্ধ চলার সময় ইরানিরা বুঝে গিয়েছিল, খাইবার শেকান দারুণ হাতিয়ার। কারণ এটি তৈরিতে খরচ কম, যেকোনো লঞ্চিং সিস্টেম থেকে ছোড়া যায় এবং এর আঘাত করার ক্ষমতাও দারুণ।

ইসরাইলের দিকেও খাইবার শেকান ছুড়েছে ইরান। যদিও ইসরাইলের দাবি, এর বেশিরভাগই তারা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, খাইবার শেকান ব্যবহার করে তারা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় ও বিমানবাহিনী কমান্ডারের সদর দফতরেও হামলা করেছে। গত মাসেই জেটচালিত ড্রোনের পাশাপাশি এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আরও এক দফা হামলার ঘোষণা দেয় তেহরান। তবে সেই হামলার ফলাফল কী হয়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

এই ক্ষেপণাস্ত্রের নামকরণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক ‘খাইবার যুদ্ধের’ স্মরণে। ৬২৮ সালের সেই সামরিক অভিযানে আরবের ইহুদিদের দখলে থাকা দুর্ভেদ্য খাইবার মরূদ্যান জয় করেছিল মুসলিম বাহিনী। একটি খাইবার শেকান তৈরি করতে ঠিক কত খরচ হয়, ইরান তা জানায়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেপণাস্ত্রকে ঠেকাতে আমেরিকা ও ইসরাইল যেসব ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে, তার তুলনায় খাইবার শেকান অনেক সস্তা। সিস্টেম ভেদে একেকটি মার্কিন ও ইসরাইলি ইন্টারসেপ্টরের পেছনে খরচ হয় ২ থেকে ১৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত!

হিঞ্জ বলেন, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আগের চেয়ে অনেক উন্নত করেছে। আগের উৎক্ষেপণগুলো নিয়ে গবেষণা করে তারা এখন বের করছে, শত্রুর প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা কীভাবে সর্বোচ্চ করা যায়। হিঞ্জ আরও বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ঠিক কোন ধরনের কৌশলগত বদল সবচেয়ে বেশি কার্যকর, ইরান তা দেখেছে। যুদ্ধের ময়দানে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটি ব্যবহারই নতুন নতুন তথ্য এনে দেয়। আর ইরানিদের জন্য এসব তথ্য দারুণ উপকারী। তিনি আরও বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে উড্ডয়নের একেবারে শেষ মুহূর্তেও গতিপথ বদলাতে পারে খাইবার শেকান।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   খাইবার মিসাইল  বরবাদ  মার্কিন মিত্ররা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: