রূপ-সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ এবং নিজেকে প্রকাশ করার ভাবনা মানুষের স্বভাবজাত। তাই ইসলাম মানুষের এই স্বভাবজাত চিন্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। সেই সঙ্গে পরিশীলিত ও পরিচ্ছন্নরূপে নিজেকে উপস্থাপনে নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম উন্নত বস্ত্র পরিধান, মাথার চুলকে পরিপাটি করে রাখা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শীলন বিন্যাসে দিয়েছে বেশ কিছু রুচিময় রীতিনীতি। ফলে ইসলামের ছোঁয়ায় মানুষের সেই সৌন্দর্যবোধ বিকশিত হয়েছে আরও সুন্দর অবয়বে।
ইসলাম মেয়েদের জন্য রেশমি ও উগ্র রঙের কাপড় পরিধানের অনুমতি দিয়েছে, অনুমতি দিয়েছে অলংকার পরিধানেও। তবে রূপ-সৌন্দর্য চর্চায় বাড়াবাড়ি ও কৃত্রিমতাকে বারণ করেছে। এ কারণেই দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথায় উচ্চ বেণি বাঁধা, কৃত্রিমরূপে দাঁতকে সুচালো করা, দাঁতের মাঝখানে কৃত্রিম ফাঁক সৃষ্টি করা এবং মাথায় কৃত্রিম চুল স্থাপনকে অপছন্দ করেছেন। অপছন্দ করেছেন চোখের ভ্রুকে কৃত্রিমরূপে চিকন করাকেও। আর এটাকে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধন বলে উল্লেখ করেছেন। মুফতিগণও এ ক্ষেত্রে মাঝামাঝি পন্থাকে পছন্দ করেছেন। তারা বলেছেন, ‘যদি কারও হাতে অস্বাভাবিক কোনো ক্ষুদ্র আঙুল গজায় তবে তা অপারেশন করে কেটে ফেলা জায়েজ আছে’ (যাদুল মাআদ : ৩/১৮৩)।
সাজ-সজ্জার এ ক্ষেত্রে ফকিহগণ স্বামীর মেজাজকেও গুরুত্ব দিয়েছে। তাই স্বামী যদি শারীরিক স্থূলতাকে পছন্দ করে তা হলে সে ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য বিশেষভাবে সারিদ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। (রদ্দুল মুহতার : ৫/২৭৫)।
এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো, ইসলাম একদিকে যেমন অস্বাভাবিক অঙ্গকে অপারেশন করে সরিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে, অন্যদিকে শুধু খাদ্যের দ্বারা শারীরিক বৃদ্ধিকেও সমর্থন করেছে। তাই এর ভিত্তিতে বলা যায়, সাজসজ্জার জন্য ক্রিম, পাউডার ইত্যাদি ব্যবহার করাতেও কোনো অসুবিধা নেই। এর কারণে আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনোরূপ বিকৃতি সাধন হয় না। আঙুলের বাইরেও যদি শরীরের অন্য কোথাও কোনো অস্বাভাবিক গোশত বৃদ্ধি পায় তবে তা অপারেশন করে সরিয়ে ফেলার অনুমতি আছে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে বয়সজনিত কারণে যদি চেহারা কুঁচকে যায় তবে অপারেশন করে তা দূর করা, অপারেশন করে নাক চোখা করা ইত্যাদি জায়েজ নেই। কারণ এটা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনের শামিল।
একইভাবে কৃত্রিম চুল ব্যবহারেও রয়েছে স্বতন্ত্র বিধান। রূপ ও সৌন্দর্য চর্চার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করাটাও ইসলাম পছন্দ করে না। গোপন করা বাড়াবাড়ির অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কৃত্রিম চুল ব্যবহার করা এবং শরীরের প্রাকৃতিক স্বাভাবিক অবস্থাকে পরিবর্তন করে নিজের চুলের সঙ্গে অন্যের চুল যুক্ত করাকে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। যারা এ জাতীয় কাজ করে তাদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন (বুখারি : ২/৮৭৮)।
এমনকি অসুস্থতার কারণেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মাথায় অন্যের চুল যুক্ত করার অনুমতি দেননি। আর এ কারণেই ফকিহগণের কেউ কেউ মাথার চুলের সঙ্গে চুল, কাপড় কিংবা অন্য যেকোনো জিনিস যুক্ত করতে বারণ করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে শরিয়তের সাধারণ বিধান হলো, চুল ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু যেমন রেশমি বা উলের ফিতা ইত্যাদি যদি ব্যবহার করা হয় তা হলে তাতে অসুবিধা নেই। অর্থাৎ যদি মানুষের চুল না হয়ে অন্য কোনো প্রাণীর চুল বা কৃত্রিম চুল হয় তা হলে তাতে সমস্যা নেই। (ফাতহুল বারি : ১০/৪৫৮; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ৫ ১৫৮)।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আরবিএন