কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘ডিস্টিলেশন’ নামের একটি প্রযুক্তিগত কৌশল। প্রযুক্তি জগতের অনেকের মতে, ছোট আকারের এআই মডেলকে দ্রুত উন্নত করার কার্যকর উপায় হলেও এটি এখন মেধাস্বত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে এক পডকাস্টে গুগল এআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী জেফ ডিন ‘ডিস্টিলেশন’ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বড় ও জটিল এআই মডেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে গুগল এ কৌশল ব্যবহার করেছে।
তার ভাষায়, শক্তিশালী একটি এআই মডেলের জ্ঞান ও সক্ষমতাকে ছোট আকারের মডেলে স্থানান্তরের মাধ্যমে তুলনামূলক কম সম্পদ ব্যবহার করেও উন্নত মানের এআই তৈরি করা সম্ভব।
তবে কয়েক মাসের মধ্যেই বিষয়টি প্রযুক্তি অঙ্গন ছাড়িয়ে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। মার্কিন আইনপ্রণেতা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ডিস্টিলেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে চীনা কোম্পানিগুলো দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এআই প্রযুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এই বিতর্ক আরও তীব্র হয় চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুনশট এআই তাদের নতুন মডেল কিমি কে৩ উন্মুক্ত করার পর। ব্যবহারকারীদের মতে, মডেলটি অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত উন্নত এআই মডেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
মার্কিন কোম্পানিগুলো সাধারণত তাদের উন্নত এআই ব্যবহারের জন্য অর্থের বিনিময়ে প্রবেশাধিকার দেয়। বিপরীতে, মুনশটসহ বেশ কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেন-ওয়েট’ মডেল প্রকাশ করছে, যা যে কেউ বিনামূল্যে ডাউনলোড, পরিবর্তন ও নিজস্ব কাজে ব্যবহার করতে পারে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, মার্কিন কোম্পানির এআই মডেল থেকে ডিস্টিলেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করেই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এত দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে মুনশটের বিরুদ্ধে অ্যানথ্রপিকের ‘ফেইবল’ মডেলের তথ্য ব্যবহার করার অভিযোগও ওঠে।
হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা মাইকেল ক্র্যাটসিওস এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, মুনশট এআই অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিমি কে৩ তৈরি করেছে। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এআই মডেল থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানটি একটি জটিল অবকাঠামো গড়ে তুলেছিল।
সহজভাবে বলতে গেলে, ডিস্টিলেশন হলো একটি উন্নত এআই মডেলের দেওয়া উত্তর বা আউটপুট ব্যবহার করে তুলনামূলক ছোট বা নতুন একটি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
বিতর্কের মূল কারণ হলো, এতে বিশাল ব্যয়ে তৈরি উন্নত মডেলের সক্ষমতা তুলনামূলক কম খরচে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রযুক্তিতে কাজে লাগাতে পারে।
এআই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সিকিউরিটি প্যালের প্রতিষ্ঠাতা পুকার হামাল বিষয়টি একটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, একজন শিক্ষার্থী যদি পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে আর অন্যজন কেবল তার খাতা নকল করে একই ফল পেতে চায়, তাহলে ডিস্টিলেশন অনেকটা সেই পরিস্থিতির মতো।
তবে ডিস্টিলেশনকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখছে না প্রযুক্তি খাতের বড় একটি অংশ। সম্প্রতি এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট, মেটা, প্যালান্টিরসহ ২০টির বেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠানো এক যৌথ চিঠিতে ওপেন-ওয়েট এআই মডেলের ওপর অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ না করার আহ্বান জানিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, একটি মডেলের আউটপুট ব্যবহার করে অন্য মডেলের সক্ষমতা বাড়ানো এআই গবেষণায় দীর্ঘদিনের স্বীকৃত ও কার্যকর একটি পদ্ধতি।
তবে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গবেষক কলিন শিয়া-ব্লিমারের মতে, মার্কিন প্রশাসন এখন মূল্যায়ন করছে— চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন প্রযুক্তির ফলাফল ব্যবহার করে অন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাচ্ছে কি না।
অন্যদিকে ক্লাউড কোম্পানি বক্সের প্রধান নির্বাহী অ্যারন লেভির মতে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও বিশ্বের সেরা প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার থাকতে হবে, প্রযুক্তিটি যে দেশেই তৈরি হোক না কেন।
গবেষকদের একটি অংশ বলছেন, ডিস্টিলেশন নতুন কিছু নয়। এনভিডিয়াসহ বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠানই নিজেদের মডেল উন্নয়নে এই কৌশল ব্যবহার করেছে এবং বিষয়টি তাদের গবেষণাপত্রেও উল্লেখ রয়েছে।
ইনফো-টেক রিসার্চ গ্রুপের গবেষণা পরিচালক শশি বেলামকন্ডা বলেন, বড় ও ব্যয়বহুল মডেলের আউটপুট ব্যবহার করে ছোট ও কম ব্যয়বহুল মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া বহুদিন ধরেই এআই উন্নয়নের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি।
তবে অ্যানথ্রপিকের অবস্থান ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চীনের ডিপসিক, মুনশট ও মিনিম্যাক্সসহ কয়েকটি কোম্পানি হাজার হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কোটি কোটি অনুরোধ পাঠিয়ে তাদের ক্লড মডেলের তথ্য সংগ্রহ ও ডিস্টিলেশন করেছে।
এ কারণে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক উভয়ই তাদের ব্যবহারের শর্তে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের এআইয়ের আউটপুট ব্যবহার করে অন্য কোনো মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এআই কোম্পানিগুলো নিজেরাও মডেল প্রশিক্ষণে বিপুল পরিমাণ বই, লেখা ও অনলাইন কনটেন্ট ব্যবহার করেছে, যা নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছে।
বইয়ের লেখকদের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ম্যাক্স প্রিটের মতে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মেধাস্বত্ব রক্ষায় সরকার যতটা সক্রিয়, সাধারণ লেখক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের অনুমতি ছাড়া ব্যবহৃত সৃষ্টিশীল কাজের সুরক্ষায় ততটা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ