ফেসবুকে ‘তান্ত্রিক’ সেজে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রতারক চক্রের সদস্যরা পটাশিয়াম ও চিনির রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নারীদের হাতের তালুতে ক্ষত সৃষ্টি করত। পরে জিনের ভয় দেখিয়ে ও ক্ষত সারানোর নামে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করত তারা।
সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর দক্ষিণ কল্যাণপুরে পিবিআই কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী।
এর আগে ২৪ জুলাই মধ্যরাতে কুমিল্লার চান্দিনা থানার হাড়িখোলা বিলের বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই প্রতারক চক্রের প্রধান অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) ও মাহে আলমকে (২৭) গ্রেফতার করে পিবিআই স্পেশালাইজড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন্সের (এসআইঅ্যান্ডও) একটি টিম।
পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন ভোর ৭টা ৪০ মিনিটে নোয়াখালীর সুধারাম থানার পূর্ব এজবালিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়ার ছোট ভাই মো. হাসান আলী (২০) নামের আরেক জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একাধিক ফোন ও সিম উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সালমা আক্তার নামের এক নারী ফেসবুকে ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামের একটি আইডির মাধ্যমে কথিত ওই তান্ত্রিকের সঙ্গে পরিচিত হন। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করার প্রলোভন দেখিয়ে ওই তান্ত্রিক প্রথমে হাদিয়া বাবদ সালমার কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পরে জালালি কবুতর কেনার অজুহাতে আরও ৩ হাজার ৫০০ টাকা বিকাশের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়।
পরবর্তী সময়ে জিনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলে ভুক্তভোগীকে বাজার থেকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনতে বলা হয় এবং ইমো ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে কথিত তান্ত্রিকের নির্দেশনা অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে বলা হয়। নির্দেশনা মেনে হাতের তালুতে পটাশ ও মিষ্টি একসঙ্গে মেলাতেই রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং ভুক্তভোগীর বাঁ-হাতের তালুতে গুরুতর দাহ্য ক্ষত (বার্ন) সৃষ্টি হয়। পরে এই ক্ষত জিনের মাধ্যমে সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আরও ১৬ হাজার টাকাসহ মোট ২১ হাজার টাকা প্রতারণা করে আত্মসাৎ করে চক্রটি। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে গত ২১ জুন খিলক্ষেত থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন।
পিবিআই মামলাটির তদন্তভার নেওয়ার পর তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। আসামিরা অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছেন এবং অহিদ মিয়া ও হাসান আলী ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতাররা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয় সদস্য। চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’, ‘আসমা কবিরাজ’ এবং ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি ও ইমো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত। বিশ্বাস অর্জনের পর তারা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি একসঙ্গে হাতের তালুতে বা নাভিতে নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখার নির্দেশ দিত।
এর ফলে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের হাত ও নাভিতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হতো। পরে সেই ক্ষত জিনের মাধ্যমে সারিয়ে দেওয়ার নাম করে এবং জিনের ভয় দেখিয়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত।
কতজন মানুষ এই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন জানতে চাইলে পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে একই ধরনের রাসায়নিক ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন ভুক্তভোগী গুরুতর আহত অবস্থায় সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন।
প্রতারক চক্রটি এই রাসায়নিক বিক্রিয়া কীভাবে শিখল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রেফতাররা মূলত ইউটিউব দেখে জানতে পারে যে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের সঙ্গে চিনি বা মিষ্টিজাতীয় কিছুু মিশিয়ে ঘর্ষণ দিলে তীব্র তাপ ও আগুনের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকেই তারা এই প্রতারণার কৌশল রপ্ত করে। তারা বেদে সম্প্রদায়ের সদস্য এবং তাদের গ্রামের অনেকেই এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত।
এই কর্মকর্তা আরও জানান, এ ধরনের আরও অন্তত চারটি মামলা বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে। এই চক্রের অন্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি