রাজধানীর কাফরুলে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবি বলছে, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজের পরিকল্পনায় এ ঘটনা ঘটে। কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে সে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে শুটার ভাড়া করে আনে।
ঘটনার বিস্তারিত জানাতে সোমবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ময়লার টেন্ডার, ফুটপাথ দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করে হাফিজ। তবে ঘটনাচক্রে অস্ত্রধারীদের গুলিতে যুবদল কর্মী ইউসুফ নিহত হন এবং দুজন গুরুতর আহত হন।
ডিবি জানায় এ ঘটনায় ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো- মো. নাহিদ হাসান, মো. শাফিন আহমেদ, মো. জিয়ারুল মোল্লা, মো. আলী হোসেন, মো. জিহাদ মোল্লা, মো. মাসুম বিল্লাহ ও মো. আবির হাওলাদার।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানায় মূল পরিকল্পনাকারী হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে সিএনজি হাফিজের প্রতিপক্ষ হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে পেশাদার খুনি ভাড়া করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।
গত ২৯ জুন পেশাদার খুনি হাসান, জিয়ারুল, চঞ্চল, জিহাদসহ অজ্ঞাত আরও ২-৩ জন ঢাকায় এসে সিএনজি হাফিজের সঙ্গে বৈঠক করে। তারা মিরপুর-১০ এলাকার বৈশাখী হোটেলের ৭১৪ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেয় এবং পরে সিএনজি হাফিজের গ্যারেজে একত্রিত হয়। এ সময় আবির হাওলাদারের কাছ থেকে হাফিজের ম্যানেজার নাহিদ দুটি পিস্তল গ্যারেজে নিয়ে আসে। হাফিজ অস্ত্রে গুলি ভরার সময় একটি পিস্তল থেকে আকস্মিক মিসফায়ার হলে ওইদিনের হত্যার পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়। তবে অভিযুক্তরা হাফিজুল ইসলাম বাবুর অফিসের আশপাশে গিয়ে তাকে শনাক্ত করে এবং সিএনজি হাফিজের কাছ থেকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যায়।
পরবর্তী সময়ে ২২ জুলাই সিএনজি হাফিজের নির্দেশে তারা পুনরায় ঢাকায় আসে এবং মিরপুর-২ এলাকার সোনালী হোটেলের ৬০৮ নম্বর কক্ষে অবস্থান নেয়। এরপর ২৩ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সবাই আবার সিএনজি হাফিজের গ্যারেজে একত্রিত হয়। সেখানে নাহিদের কাছ থেকে জিহাদ দুটি লোড করা পিস্তল নিয়ে একটি জিয়ারুল এবং অন্যটি চঞ্চলের কাছে হস্তান্তর করে।
পরে জিয়ারুল, চঞ্চল, হাসান, জিহাদ, মাসুম বিল্লাহসহ অজ্ঞাত আরও ২-৩ জন হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। সিএনজি হাফিজের কর্মচারী শাফিন এবং জিয়ারুলের আত্মীয় আলী হোসেন ঘটনাস্থল রেকি, আসামিদের পালিয়ে যেতে সহায়তা এবং ঘটনার পর পুলিশের তৎপরতা ও এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে।
ঘটনার দিন রাত ১১টার দিকে হাফিজুল ইসলাম বাবু তার কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে অবস্থানকালে অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিকে সন্দেহ হলে তাদের পরিচয় জানতে চান। একপর্যায়ে তাদের দেহ তল্লাশি করার চেষ্টা করলে অভিযুক্তদের একজন পিস্তল বের করে গুলি চালায়। এতে যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ সময় সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও মো. মনির হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। তারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার সময় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে স্থানীয় জনতা অস্ত্রসহ এক সন্ত্রাসীকে আটক করে কাফরুল থানায় সোপর্দ করে। পরবর্তী সময়ে পুলিশ তার দেহ তল্লাশি করে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহত ইউসুফের বড় ভাই বাদী হয়ে কাফরুল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ডিবিপ্রধান বলেন, স্থানীয় আধিপত্য, ময়লার টেন্ডার; ফুটপাথের দোকান, ব্যবসা ও জমি দখল এবং আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচন কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখেও এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। হাফিজুর রহমানকে এই পরিকল্পনার মূল ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমরা তাদের সন্ত্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করছি। ভিকটিম ও টার্গেট উভয়পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় তদন্তে এসেছে। যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি