নতুন সূচনা পুরান বন্দোবস্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষা

দীর্ঘ বিরতির পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের প্রত্যাবর্তনকে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল

2026-07-30T00:42:29+00:00
2026-07-30T00:46:31+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,
১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
নতুন সূচনা পুরান বন্দোবস্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪২ এএম  আপডেট: ৩০.০৭.২০২৬ ১২:৪৬ এএম
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ বিরতির পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের প্রত্যাবর্তনকে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের অধিকার, জবাবদিহি ও কল্যাণ কেন্দ্র করে ঘটবে কাঙ্ক্ষিত পালাবদল। কিন্তু মেয়াদের বড় একটি অংশ পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেই পরিবর্তনের বড় চিত্র স্পষ্ট হয়নি। কোথাও কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ ও সীমিত সাফল্য মিললেও আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, একাডেমিক সংস্কারসহ মৌলিক অনেক প্রতিশ্রুতি এখনও অপূর্ণ। পাশাপাশি কয়েকটি ক্যাম্পাসে দলীয় প্রভাব ও বিতর্কও আলোচনায় এসেছে। ফলে ছাত্র সংসদগুলোর প্রত্যাবর্তন নতুন আশা জাগালেও, যে পালাবদলের ঘোষণা ছিল তা এখনও অনেকটাই অসমাপ্ত অধ্যায়। 

ডাকসু নেতাদের মাঝে দলীয় ছাপ ঘিরে বিতর্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) শিক্ষার্থীদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। তবে বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটির রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। 

সমালোচকদের মতে, শিক্ষার্থীদের অধিকার, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহির ছাত্ররাজনীতির আদর্শ উপস্থাপন করতে পারেনি ডাকসু। দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে বেরিয়ে স্বাধীন ছাত্ররাজনীতির নতুন ধারা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আগের মতো রাজনীতির পুনরাবৃত্তিই দেখা যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল যে ডাকসু দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নীতিনিষ্ঠ, স্বাধীন ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক রাজনীতির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, কিন্তু সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে সেটি নিয়ে চলছে বিতর্ক ও আলোচনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালে সবশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়। এ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের বড় প্রশ্ন ছিল ডাকসু কি স্বাধীন ছাত্র নেতৃত্বের জায়গা হয়ে উঠবে, নাকি আবারও দলীয় প্রভাবের রাজনীতিতে ফিরে যাবে। আগে এমন নজির রয়েছে ডাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার না দেখে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে রাজনৈতিক দলের আদর্শ বাস্তবায়নে।

২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন প্যানেল নিজেদের ‘ইনক্লুসিভ’ বলে দাবি করলেও নির্বাচনের ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতেই জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। নির্বাচিত হ‌ওয়ার পর ডাকসু কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ বাস্তবায়ন করবে না বলে প্রতিনিধিরা দাবি করলেও পরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দলীয় লেজুড়বৃত্তির অভিযোগ ওঠে।

কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রী ডাকসু নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, যখন‌ই ক্যাম্পাসে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, সে ক্ষেত্রে বিবৃতি বা প্রতিবাদ জানানোর ক্ষেত্রে পক্ষপাত হিসেবে দেখি। জামায়াতের নেতা যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘বেশ্যা’ সম্বোধন করে তখন ডাকসুর কোনো বিবৃতি দেখি না। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে ডাকসু তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ডাকসু ভূমিকম্পের কারণ দেখিয়ে ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন বন্ধ রেখে এবং জামায়াতের হয়ে নির্বাচনে প্রচার করেছে। এটি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থীদের হয়ে গণসংযোগ চালাতে দেখা যায় একাধিক ডাকসু প্রতিনিধিকে। এ ছাড়া ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়রপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী।

অন্যদিকে ডাকসুর বিভিন্ন সেমিনার ও প্রোগ্রামে জামায়াত সমর্থিত নেতাদের আধিপত্য রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। গত কয়েক মাসের প্রোগ্রামের অতিথিদের নামের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অতিথি হিসেবে ছাত্রদল কিংবা বিএনপির তেমন কোনো নেতা নেই। বরং এসব প্রোগ্রামের অনেক অতিথিই জামায়াত সমর্থিত। প্রোগ্রামগুলোয় রয়েছে ‘গণভোট ও অধ্যাদেশ, সংস্কার আলাপ’ তবে ডাকসু নেতাদের দাবি, সব মতাদর্শের লোক অতিথি করতে চাইলেও সবাই আগ্রহী হন না।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে ডাকসুর বিবৃতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও দলীয় দিক বিবেচনা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি শামীম আহসান ডাকসু নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, ‘ডাকসু মাদকের আড্ডাখানা-বেশ্যাখানা ছিল।’ এই বিতর্কিত মন্তব্যের পরেও ডাকসুর পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি ও নিন্দা প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘হাটহাজারী মাদরাসা’র সঙ্গে তুলনা করলে এটিকে ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য বলে অভিযোগ করে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ডাকসু। এই বক্তব্যের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতেও বলা হয়।

এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ডাকসু তার নিজস্ব আদর্শ হাজির করতে পারেনি বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাব্বির আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘ডাকসুর কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভিশন ও নীতিনির্ভর নেতৃত্ব দেখতে পাব। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের আদর্শিক অবস্থান স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রেই ডাকসুর কার্যক্রম জাতীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। ফলে শিক্ষার্থীদের অধিকার, শিক্ষা সংস্কার ও ক্যাম্পাস গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে নতুন ধারার ছাত্ররাজনীতি গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনও পূরণ হয়নি।’

যা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক অধিকার আদায়ের কাজ করাই ডাকসুর মূল উদ্দেশ্য। ডাকসু নির্বাচনে আমরা দেখেছি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার না করে বিভিন্ন প্যানেল আলাদা নাম ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। সেখানে প্রতিটি প্যানেল নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের প্রার্থী বা প্যানেলকে নির্বাচিত করেছে। ডাকসুর সদস্যরা নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো দলের হয়ে কাজ করতে পারে না বরং তখন তারা সব শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি হয়ে যায়। তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে কিন্তু কাজের মাধ্যমে তার যেন বাস্তবায়ন না ঘটে। তারা সব শিক্ষার্থীর কথা মাথায় রেখে কাজ করবেন।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘ডাকসু মূলত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কথা বলবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবে। কিন্তু আগেও যেমন দেখেছি ডাকসু কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ বাস্তবায়নে চেষ্টা করেছে বর্তমানেও এমন প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। তারা দলের আদর্শকে ডাকসুর আদর্শ বলে প্রচার করছে যা কখনো কাম্য নয়।‌ ডাকসু হ‌ওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর, কোনো নির্দিষ্ট দলের না।’

যা বলছেন ডাকসু নেতারা : ডাকসুর এজিএস (সহ-সাধারণ সম্পাদক) ও ঢাবি শিবিরের সভাপতি মহিউদ্দীন খান বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের পর থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়েই কাজ করেছি এবং শিক্ষার্থীরা এটি ভালোভাবেই জানেন।’

ডাকসুর বিভিন্ন প্রোগ্রামে অতিথিদের মধ্যে অধিকাংশই একটি দলের হন এমন অভিযোগে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো প্রোগ্রামের আয়োজন করলে সেখানে প্রত্যেকে দলমত থেকেই অতিথিদের দাওয়াত দেওয়ার চেষ্টা করে থাকি। অনেক সময় দেখা যায় যারা সমালোচনা করছেন সেই দল থেকেই যারা আলোচক তারা আসেন না। তাই মনে করি এটি অনেকটা দায় দিয়ে দেওয়ার রাজনীতির মতো। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি ডাকসুর একমাত্র আদর্শ শিক্ষার্থীদের হয়ে কাজ করে যাওয়া, আমরা সেই কাজ‌ই করে যাচ্ছি।’

ডাকসু প্রতিনিধি হয়ে একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি হিসেবে এটি আমার অধিকারের ভেতরে পড়ে আমি কারও কাছে ভোট চাইব কি চাইব না এবং সেটি কি ভিত্তিতে চাইব। আমি কোনো দলের এজেন্ডা এই ক্যাম্পাসে বাস্তবায়ন করেছি কি না এটি হচ্ছে লেজুড়বৃত্তির মূল জায়গা।’

৩৩ বছরের প্রতীক্ষা ঘুচলেও জাকসুতে প্রাপ্তি সামান্য

দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা। পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশনসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তবে প্রায় ১০ মাস পর শিক্ষার্থীরা এখন কষছেন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব। তাদের একাংশের দাবি, কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকলেও অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। পাশাপাশি দলীয় প্রভাবমুক্ত ছাত্র সংসদের অঙ্গীকার নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ২০টিতে বিজয়ী হয় ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট। তাদের প্রচারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘৫ ইয়েস’, যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত ডাইনিং ব্যবস্থা, পরিবহন সংকট নিরসন, প্রশাসনিক অটোমেশন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের নেতৃত্বে নির্বাচিত বর্তমান ভিপি আব্দুর রশিদ জিতুও ইশতেহারে একাধিক সংস্কারমূলক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। সেখানে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, স্মার্ট আইডি কার্ড, ফ্রি ওয়াই-ফাই, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা এবং শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গঠনের অঙ্গীকার ছিল। নির্বাচনের পর শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল, এসব প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাকসু কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ছাত্র সংসদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

দশ মাসে জাকসুর কিছু কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের নজরে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসবের আয়োজন। দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কর্মশালা। বটতলায় ওয়াশরুম স্থাপনের উদ্যোগ। কিছু সড়ক প্রশস্তকরণ ও ফুটপাথ নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেটেরিয়ায় তিন বেলা খাবার সরবরাহ চালুর উদ্যোগে সমন্বয়। এসব উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতে, এগুলো নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর তুলনায় সীমিত অর্জন।

শিক্ষার্থীরা জানান, জাকসুর সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতিগুলোর অনেকই এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। পরিবহন সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি, বাস ও রুট ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি, ডাইনিং ভর্তুকি কার্যকর হয়নি, ডিজিটাল কুপন ব্যবস্থা চালু হয়নি, স্বাস্থ্যবীমা চালু হয়নি। আধুনিক ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠা হয়নি, ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা যায়নি, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু হয়নি, খাতা পুনর্মূল্যায়নের নীতিমালা প্রণীত হয়নি। আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া প্রশিক্ষক নিয়োগ বাস্তবায়িত হয়নি, স্মার্ট আইডি কার্ড চালু হয়নি, ক্যাম্পাসজুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই লাগলেও এর কোনো যথাযথ ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশনও এখন পর্যন্ত আংশিক পর্যায়ে রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের সময় যেভাবে উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মনে হয়েছিল জাকসু আমাদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর হবে। কিন্তু ৯ মাস পর এসে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই এখনও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।’

অনেক শিক্ষার্থীর মতে, ছাত্র সংসদের কার্যক্রম এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক। অথচ শিক্ষার্থীদের প্রধান চাহিদা ছিল পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও একাডেমিক সংস্কারের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সমাধান। তবে আরেকটি অংশের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, মাত্র দশ মাসে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগতেই পারে।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্যানেল বিশেষ করে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অন্যদিকে সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটও শিক্ষার্থী কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিল। তবে গত দশ মাসে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ইস্যুতে জাকসুর অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

একাংশের অভিযোগ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ছাত্র সংসদের অবস্থান দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাবমুক্ত বলে মনে হয়নি। প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্তে তারা প্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে। বরং কয়েক দিন আগে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেছেন। অন্যদিকে জাকসুর নেতাদের দাবি, তারা দলীয় পরিচয়ের বাইরে থেকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই কাজ করছেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

জাকসুর পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক সাফায়েত মীর বলেন, ‘আমরা জাকসু থেকে চেষ্টা করেছি আমাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করার কিন্তু প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কারণে এখনও আমাদের অনেক প্রতিশ্রুতি বাকি রয়েছে বিশেষ করে অটোমেশন এখনও আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। তবে আমার ব্যক্তিগত যেই ইশতেহার ছিল লেক সংস্কার এবং লেক খননের বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বারবার কথা বলেছি কিন্তু প্রশাসনের কাছ থেকে সে পরিমাণ কোনো সহযোগিতা আমি পাইনি।

জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ইশতেহারের বেশ কিছু বিষয় ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে এবং আরও কিছু উদ্যোগ চলমান রয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে বাকি প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।’

চাকসুর প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির হিসাব কষছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর গত বছরের ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উচ্ছ্বাস উদ্দীপনার মধ্যে হাজারো শিক্ষার্থী ভোট দেন এই নির্বাচনে। প্রতীক্ষিত চাকসু নেতৃত্ব পেয়ে শিক্ষার্থীরা দারুণ খুশি। নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’-এর প্রার্থীরা ২৬ পদের মধ্যে ভিপি-জিএসসহ ২৪ পদে জয়লাভ করেন।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করার কেউ ছিল না দীর্ঘ সময়। আর এই সময় যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের প্রতাপ ছিল। অর্থাৎ সেই দলের ছাত্র সংগঠনের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু চাকসু নির্বাচনের পর সেই ধারা অনেক বদলে যায়। শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্যা, দাবি-দাওয়া আদায়ে বৈধ প্রতিনিধি পেয়েছেন বলে মনে করছেন।  

নির্বাচনের পর চাকসুর মেয়াদও শেষ হতে চলেছে। ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে সাড়ে আট মাস। এই সময় পাওয়া না পাওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। চাকসুর প্রতিশ্রুতির অনেক কিছু বাস্তবায়ন হয়নি বলে মনে করছেন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। 

তবে অনেকের মতে কম সময়ে ছোট ছোট অনেক দাবি পূরণ হয়েছে। যা শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক। তবে নির্বাচনে বিজয়ী প্যানেলের ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা পাওয়া না পাওয়ার হিসাব কষছেন। বিশেষ করে আবাসন সংকট ও পরিবহন সমস্যার কার্যকর সমাধান না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর অতিমাত্রার প্রত্যাশা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে। আবার ছোট ছোট অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের অনেকে দারুণ খুশি।

গত বছরের ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় চাকসু নির্বাচনের আগে শিবির-সমর্থিত প্যানেল বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাদের ইশতেহারের মূল বিষয় ছিল হলের খাবারের মান উন্নয়ন, আবাসন সংকট নিরসন, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ইশতেহারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে নতুন হল নির্মাণ, খাবারের মানোন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, নতুন শাটল ট্রেনসহ বাস সংযোজনের মতো বিষয়গুলো এখনও প্রাথমিক আলোচনা বা প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

চাকসুর কার্যক্রম সম্পর্কে ইতিহাস বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহীন আলম বলেন, ১৯৯০ সালের পর প্রায় ৩৬ বছর চট্টগ্রাম চাকসু নির্বাচন না হওয়ায় দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত ছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকসু কাজ করতে পারেনি। তবে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট চাহিদা মেটাতে মোটামুটি ভালোই কাজ করছে। আর চাকসুর সফলতা বা ব্যর্থতার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে। চাকসু শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি প্রশাসনের কাছে তুলে ধরে। এসব দাবি বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রশাসনের ওপরই নির্ভর করে। কারণ চাকসুর নেতাদের যে বাজেট দেওয়া হয় তার ওপর ভিত্তি করেই তারা কাজ করে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের এক শিক্ষার্থী বলেন, চাকসু শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক ভালো কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন একাডেমিক, প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে সাহায্য করছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হলে শিক্ষার্থীরা এগুলো থেকে বঞ্চিত হতো। তবে ভালো কাজ করলেও চাকসুর কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতা রয়েছে। যেগুলোর কারণে চাকসু কিছুটা সাফল্য অর্জন করলেও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। আবাসিক হলগুলোতে মেধার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ দিলেও অনেক শিক্ষার্থী এখনও অনাবাসিক। হলগুলোর খাবারের মান কিছুটা উন্নত হলেও কিছুদিন পরপর আবার আগের মতোই হয়ে যায়। যোগাযোগ ও পরিবহন বিষয়ে শাটলের ভোগান্তি আগের মতোই রয়ে গেছে। 

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন বলেন, চাকসু শিক্ষার্থীদের স্বার্থে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পায় না। তাই অনেক ক্ষেত্রে চাকসুর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন যাতায়াত ও আবাসনসহ বিভিন্ন দাবিতে চাকসু নিয়মিত নোটিস দিয়েছে এবং আন্দোলন করেছে। কিন্তু প্রশাসন এসব দাবিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে চাকসুর নেওয়া কিছু উদ্যোগ আবার প্রশংসনীয়। বিশেষ করে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন, শাটলে নতুন বগি সংযোজন, হলগুলোতে নতুন করে আসন বরাদ্দ ও আবাসিক সুবিধা সম্প্রসারণ, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক উপকারী হয়েছে। তবু সব মিলিয়ে চাকসুর কার্যক্রম পুরোপুরি সফল বলা যাবে না।

চাকসুর কার্যক্রম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই চাকসু শিক্ষার্থীদের স্বার্থে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হলগুলো থেকে মার্কশিট ও বিভিন্ন ফরম উত্তোলনে ২০ টাকা প্রদানের প্রচলিত ইস্যু বন্ধ করেছে। পাশাপাশি অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু ও তা সহজীকরণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনায় দুটি ফ্রি মেডিকেল ও মেডিসিন ক্যাম্প আয়োজন করা হয়, মেডিকেল সেন্টারে অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং প্রাইভেট মেডিকেল প্যাথলজিতে চবি শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি হলে ফার্স্ট এইড বক্স স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পরিবহন সুবিধা বাড়াতে জোবাইক চালু এবং শাটলে নতুন বগি সংযোজন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুরক্ষায় সাইবার বুলিং সেল গঠন করা হয়েছে। আইনগত সহায়তার জন্য ফ্রি লিগ্যাল এইড ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। একাডেমিক ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে সহায়তার অংশ হিসেবে মাস্টার্স (থিসিস), এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লাইব্রেরিতে জেনারেটর স্থাপন, বই নিয়ে প্রবেশের অনুমতি চালু করা হয়েছে।

চাকসুর কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, প্রায় নয় মাস আগে চাকসু নির্বাচিত হলেও এর কার্যকারিতা কতটুকু তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আগামী নির্বাচনে মূল্যায়ন করবে। আমার জানামতে এবং আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা সরকার কোনো উদ্যোগ নিলেই চাকসু সেটার কৃতিত্ব নেওয়ার রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকে। ক্রেডিট নেওয়া ছাড়া বাস্তবিক অর্থে চাকসুর পক্ষ থেকে বড় কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

চাকসুর কার্যক্রম নিয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হাবিবুল্লাহ খালেদ বলেন, সাধারণত নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। তবে চাকসুর বর্তমান নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিগত আট মাসে এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াননি। অনৈতিকতা, অন্যায়, চাঁদাবাজিসহ কোনো ধরনের বিতর্কিত কার্যক্রমে চাকসুর প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নেই। ছাত্ররাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি একটি নতুন দিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোজাম্মেল হক বলেন, দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকায় তাদের কোনো নির্দিষ্ট অফিস কিংবা বাজেট ছিল না। ফলে কার্যত পুরো ব্যবস্থাটিই নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। এই বাস্তবতার পরও ছাত্র সংসদের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল বেশি। সামগ্রিকভাবে বর্তমান কমিটি সেই প্রত্যাশার তুলনায় মোটামুটি ভালোই কাজ করছে। নিয়মিতভাবে প্রতি বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এবং কার্যক্রম ধারাবাহিক হলে ভবিষ্যতে ছাত্র সংসদের কার্যকারিতা আরও বাড়বে।

গন্ডগোল লেগেই থাকে রাকসুতে, কিছু নেতা সমালোচিত

শিক্ষার্থীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেয়ে বারবার আলোচনায় এসেছে রাকসু নেতাদের বিতর্কিত কাণ্ড। বিশেষ করে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের একের পর এক কাণ্ডে বরাবরই খবরের শিরোনাম হয়েছে রাকসু। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর গত অক্টোবরের ১৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। দীর্ঘ বঞ্চনার পর রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা ছিল সবার। তবে আট মাস পার হতে রাকসু ঘিরে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা প্রশ্নের মুখে। চোখধাঁধানো প্রতিশ্রুতি আর পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ শিক্ষার্থীদের সেই প্রত্যাশা পূরণে কতটা সফল তা নিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে নানা আলোচনা। 

রাকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদের ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতেই জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। বাকি তিনটি পদের মধ্যে জিএস পদে আধিপত্যবিরোধী ঐক্য প্যানেল থেকে সাবেক সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় নার্গিস খাতুন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ নির্বাচিত হন।

শিবির-সমর্থিত প্যানেলের ঘোষিত ২৪ দফার ইশতেহারগুলোর মধ্যে ছিল মানসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অধিকার সংরক্ষণ, লাইব্রেরি ও রিডিং রুম সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সেবা, চিকিৎসাকেন্দ্রের আধুনিকীকরণ, তথ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, অন-ক্যাম্পাস জব চালু, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়ন এবং ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন ক্যাম্পাস গঠন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি।

এখন পর্যন্ত ঘোষিত ২৪ ইশতেহারের মধ্যে মানসম্মত খাবারের জন্য নিয়মিত তদারকি, লাইব্রেরি সংস্কার ও এসি স্থাপনে সহযোগিতা, আবাসিক হলগুলোতে ফাস্ট এইড বক্স প্রদান, বেশ কিছু সভা সেমিনার ও কর্মশালা করেছে রাকসু। এ ছাড়া শপথগ্রহণের ১০০ দিন পর রাকসু তাদের কার্যক্রমের একটি তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ১০৩টি কাজের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এই তালিকার অন্তত ৩০টি কার্যক্রমই ছিল মতবিনিময় সভা, সৌজন্য সাক্ষাৎ, সমাধী জিয়ারত, স্ক্রিনে খেলা প্রদর্শন, স্মারকলিপি প্রদান ও কাওয়ালির মতো আয়োজন, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক শিক্ষার্থী। এ ছাড়া ইশতেহারে থিসিস শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ হাজার টাকা প্রণোদনার ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি নেই।

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীর শাকিল আহমেদ বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন ছিল সব শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়া, অধিকার ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিরুদ্ধে নতুন স্বপ্নের প্রতীক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সংকট আবাসন সমস্যা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৭২ বছরের ইতিহাসে ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনও পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার বাইরে। অনেক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে অনিরাপদ ও ব্যয়বহুল বিকল্প ব্যবস্থায় থাকতে হচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয় বরং শিক্ষাজীবনের মান, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। রাকসু নির্বাচনের সময় এই সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতি ছিল অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই সমস্যাটি এখনও আমাদের প্রতিদিনের ভোগান্তির কেন্দ্রে রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আমাদের মেডিকেল সেন্টারের স্বাস্থ্যসেবা ও হল ডাইনিংয়ের মানোন্নয়নও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর অভাব, কাক্সিক্ষত সেবার ঘাটতি, নিম্নমানের খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এখনও আমাদের ভোগান্তিতে ফেলছে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি এসব ইস্যুতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে। কিন্তু কিছু ছোটোখাটো পদক্ষেপ বা প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গেলেও মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন এখনও প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত রয়ে গেছে।

ফিন্যান্স বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোসাব্বিরুল আজিজ আসিফ বলেন, রাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা যে প্রত্যাশা নিয়ে শিবির-সমর্থিত প্যানেল সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটকে নির্বাচিত করেছিল, তা পূরণে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ১২ মাসে ২৪টি সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, গত আট মাসে সেসব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি। নির্বাচিত হওয়ার পর আবাসিক হলের খাবারের মানোন্নয়নে কিছু খণ্ডকালীন উদ্যোগ দেখা গেলেও বর্তমানে তা আর অব্যাহত নেই। কিন্তু সার্বিকভাবে প্রতিশ্রুতির সিংহভাগই কাজ বাদ রয়েছে।

রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, রাকসু সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে কাজ করছে, খেলাধুলার বিষয় নিয়ে কাজ করছে, ডিবেট লিটারেচার নিয়ে কাজ করছে, এর বাইরে অধিকারভিত্তিক কাজগুলোও রাকসু করছে। রাকসুর কাজ হলো প্রশাসনকে চাপ সৃষ্টি করা, সেটা শতভাগই হচ্ছে। 

রাকসুর ভিপি ও রাবি শিবিরের সাবেক সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও শিবির-সমর্থিত প্যানেল শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। হল দখল ও গণরুম সংস্কৃতি বন্ধ, পাশাপাশি ম্যাগাজিন, সাহিত্য আড্ডা ও বিভিন্ন দিবস উদযাপনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবাসন সংকট নিরসন, অনাবাসিক ভাতা, ডাইনিংয়ের মানোন্নয়ন ও মেডিকেল সেবা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি শিগগিরই দেখা যাবে। 

রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, রাকসু নির্বাচন হয়েছিল শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে। শিক্ষার্থীরা তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছে। নির্বাচনের আগে তারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে রাকসুর সভাপতি হিসেবে আমি রাকসুর বডির কাছে এই বার্তা দেব যে তারা যেন নির্দিষ্ট মতাদর্শকে সাইডে রেখে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যে কাজ করে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আরবিএন 


  বিষয়:   ডাকসু  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: